শিশুদের চিকেন পক্স: লক্ষণ, কারণ, চিকিৎসা ও প্রতিরোধের উপায়
শিশুদের মধ্যে চিকেন পক্স একটি পরিচিত ভাইরাসজনিত রোগ। অনেক সময় এটি হালকা থাকে এবং ১–২ সপ্তাহের মধ্যে
ভালো হয়ে যায়। তবে সব শিশুর ক্ষেত্রে বিষয়টি একই রকম নয়। নবজাতক, রোগ প্রতিরোধক্ষমতা কম এমন শিশু, দীর্ঘদিন
স্টেরয়েড বা বিশেষ ওষুধ খাচ্ছে এমন শিশু, অথবা জটিল লক্ষণ থাকা শিশুর ক্ষেত্রে চিকেন পক্স বেশি ঝুঁকিপূর্ণ হতে
পারে। তাই লক্ষণ দেখা দিলে ঘরোয়া যত্নের পাশাপাশি সতর্ক পর্যবেক্ষণ জরুরি।
চিকেন পক্সের প্রধান লক্ষণ হলো চুলকানিযুক্ত ফুসকুড়ি, যা পরে পানি ভরা ছোট ফোস্কার মতো হয় এবং কয়েক দিনের মধ্যে
শুকিয়ে খোসা পড়ে। এটি
varicella-zoster virus
বা VZV নামের ভাইরাসের কারণে হয় এবং খুব সহজে একজন থেকে আরেকজনের মধ্যে ছড়াতে পারে। CDC অনুযায়ী, চিকেন পক্স
সাধারণত ৪–৭ দিন স্থায়ী হয় এবং এটি খুব সংক্রামক একটি রোগ। এই ব্লগে আমরা শিশুদের চিকেন পক্স এর লক্ষণ,
কারণ, চিকিৎসা ও প্রতিরোধের বিস্তারিত জানব।
চিকেন পক্স হলো একটি ভাইরাল সংক্রমণ, যা সাধারণত শিশুদের বেশি হয়। আগে এটি খুব সাধারণ শিশু-রোগ হিসেবে দেখা যেত।
এখন টিকা নেওয়ার কারণে অনেক দেশে এর হার কমেছে। তবে বাংলাদেশসহ অনেক জায়গায় এখনো শিশুদের মধ্যে চিকেন পক্স দেখা
যায়।
এ রোগে শিশুর শরীরে ছোট দানা বা র্যাশ বের হয়। প্রথমে এগুলো লালচে বা গোলাপি দাগের মতো দেখা যায়। পরে
সেগুলো পানি ভরা ফোস্কায় রূপ নেয়। এরপর ফোস্কা শুকিয়ে খোসা পড়ে। চিকেন পক্সের দাগ শরীরের যেকোনো অংশে হতে পারে,
এমনকি মুখের ভেতরেও হতে পারে।
শিশুদের চিকেন পক্সের লক্ষণ সাধারণত জ্বর, শরীর ব্যথা, দুর্বলতা এবং চুলকানিযুক্ত র্যাশ দিয়ে শুরু হয়।
প্রথমে ছোট লাল দাগ দেখা যায়, পরে সেগুলো পানি ভরা ফোস্কায় পরিণত হয় এবং ধীরে ধীরে শুকিয়ে খোসা পড়ে। তাই শিশুর
ত্বকে এমন দানা বা ফোস্কা দেখা দিলে শুরু থেকেই সতর্ক থাকা জরুরি। চিকেন পক্সের লক্ষণ সব শিশুর ক্ষেত্রে একরকম
নাও হতে পারে। তবে সাধারণত নিচের লক্ষণগুলো দেখা যায়—
চিকেন পক্সের বেশিরভাগ ক্ষেত্রে চিকিৎসার মূল লক্ষ্য হলো শিশুর অস্বস্তি কমানো, জ্বর নিয়ন্ত্রণে রাখা, চুলকানি
কমানো এবং জটিলতা প্রতিরোধ করা। নিজের ইচ্ছামতো অ্যান্টিবায়োটিক বা অ্যান্টিভাইরাল ওষুধ শুরু করা ঠিক নয়।
শিশুকে পর্যাপ্ত পানি, তরল খাবার ও বিশ্রাম দিন। জ্বর থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী প্যারাসিটামল দেওয়া যেতে
পারে। চুলকানি কমাতে ক্যালামাইন লোশন বা ডাক্তার-পরামর্শকৃত অ্যান্টিহিস্টামিন সাহায্য করতে পারে। চিকেন পক্সে
সাধারণত নির্দিষ্ট কোনো “কিউর” নেই; চিকিৎসা মূলত উপসর্গ কমানোর জন্য দেওয়া হয়।
শিশুর নখ ছোট করে কেটে দিন, যাতে চুলকালে ত্বকে ক্ষত না হয়। ঢিলেঢালা, নরম সুতির কাপড় পরান। ঘাম বেশি হলে
চুলকানি বাড়তে পারে। তাই শিশুকে পরিষ্কার ও আরামদায়ক পরিবেশে রাখুন।
চিকেন পক্স হলে কি করা উচিত নয়?
চিকেন পক্স হলে শিশুর ত্বক, জ্বর এবং শরীরের দুর্বলতার দিকে বিশেষ খেয়াল রাখা জরুরি। কিছু ভুল অভ্যাস যেমন
ফোস্কা খোঁচানো, নিজে নিজে ওষুধ দেওয়া বা শিশুকে বাইরে পাঠানো সংক্রমণ ও জটিলতার ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
ফোস্কা খোঁচানো বা ফাটানো যাবে না
নিজে নিজে অ্যান্টিবায়োটিক শুরু করা যাবে না
ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া অ্যান্টিভাইরাল ওষুধ দেওয়া যাবে না
শিশুকে স্কুলে বা ডে কেয়ারে পাঠানো যাবে না
অন্য শিশু, নবজাতক, গর্ভবতী নারী বা রোগ প্রতিরোধক্ষমতা কম এমন মানুষের কাছে নেওয়া যাবে না
অ্যাসপিরিন দেওয়া যাবে না
শিশুর চিকেন পক্সের চিকিৎসা পদ্ধতি
শিশুর চিকেন পক্সের চিকিৎসা সাধারণত উপসর্গ কমানো, চুলকানি নিয়ন্ত্রণ, জ্বর কমানো এবং ত্বকে সংক্রমণ ঠেকানোর ওপর
নির্ভর করে। বেশিরভাগ শিশুর ক্ষেত্রে এটি ৭–১০ দিনের মধ্যে ধীরে ধীরে ভালো হয়ে যায়। তবে শিশুর বয়স কম হলে,
জ্বর বেশি থাকলে, ফুসকুড়িতে পুঁজ দেখা দিলে বা শিশু খুব দুর্বল হয়ে পড়লে দ্রুত শিশু বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া
জরুরি।
পর্যাপ্ত বিশ্রাম দিন: শিশুকে ঘরে শান্ত পরিবেশে বিশ্রাম নিতে দিন। শরীর দুর্বল থাকলে বেশি নড়াচড়া না
করাই ভালো।
পানি ও তরল খাবার বেশি দিন: জ্বর থাকলে শরীরে পানির ঘাটতি হতে পারে। তাই পানি, স্যুপ, ডাবের পানি বা
নরম তরল খাবার দিন।
জ্বর নিয়ন্ত্রণ করুন: জ্বর বা শরীর ব্যথা থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী প্যারাসিটামল দেওয়া যেতে
পারে। শিশুকে কখনোই অ্যাসপিরিন দেবেন না।
চুলকানি কমানোর ব্যবস্থা করুন: শিশুর নখ ছোট করে কেটে দিন। চিকিৎসকের পরামর্শে ক্যালামাইন লোশন বা
নিরাপদ অ্যান্টিহিস্টামিন ব্যবহার করা যেতে পারে।
ঢিলেঢালা সুতির কাপড় পরান: নরম ও ঢিলেঢালা কাপড় শিশুকে আরাম দেয়। আঁটসাঁট কাপড় ফোস্কায় ঘষা লাগিয়ে
অস্বস্তি বাড়াতে পারে।
ফোস্কা খোঁচাতে দেবেন না: ফোস্কা খোঁচালে ক্ষত হতে পারে এবং ত্বকে ইনফেকশনের ঝুঁকি বাড়ে। তাই শিশুকে
সাবধানে বুঝিয়ে রাখতে হবে।
নিজে নিজে অ্যান্টিবায়োটিক দেবেন না: চিকেন পক্স ভাইরাসজনিত রোগ। তাই অ্যান্টিবায়োটিক সাধারণত প্রয়োজন
হয় না, যদি না ত্বকে ব্যাকটেরিয়াল ইনফেকশন হয়।
ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া অ্যান্টিভাইরাল ওষুধ নয়: কিছু ঝুঁকিপূর্ণ শিশুর ক্ষেত্রে অ্যান্টিভাইরাল ওষুধ
দরকার হতে পারে। তবে এটি অবশ্যই চিকিৎসকের সিদ্ধান্তে নিতে হবে।
শিশুকে স্কুল বা ডে-কেয়ারে পাঠাবেন না: সব ফোস্কা শুকিয়ে খোসা না পড়া পর্যন্ত শিশুকে ঘরে রাখুন। এতে
অন্যদের মধ্যে সংক্রমণ ছড়ানোর ঝুঁকি কমে।
জটিল লক্ষণ দেখলে দ্রুত ডাক্তার দেখান: বেশি জ্বর, শ্বাসকষ্ট, চোখের কাছে র্যাশ, পুঁজ, অতিরিক্ত
দুর্বলতা বা শিশুর বয়স ১ বছরের কম হলে দ্রুত শিশু বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন।
চিকেন পক্স নিয়ে সতর্ক আছেন?
সঠিক চিকিৎসা সহায়তার জন্য ডা. সালাহউদ্দিন মাহমুদ-এর সাথে যোগাযোগ করুন।
চিকেন পক্স বেশিরভাগ সময় ঘরোয়া যত্নে ভালো হয়ে যায়, তবে সব শিশুর ক্ষেত্রে বিষয়টি হালকা নাও হতে পারে। জ্বর বেশি
থাকলে, শিশু খুব দুর্বল হয়ে পড়লে, ফোস্কায় ইনফেকশনের লক্ষণ দেখা দিলে বা চোখের আশপাশে র্যাশ হলে দ্রুত
ডাক্তার দেখানো উচিত।
জ্বর অনেক বেশি বা দীর্ঘদিন থাকে
শিশু খুব দুর্বল, নিস্তেজ বা অস্বাভাবিক ঘুম ঘুম থাকে
শ্বাসকষ্ট হয়
বারবার বমি হয়
ফোস্কার চারপাশ লাল, ফুলে যায়, গরম লাগে বা পুঁজ বের হয়
চোখের কাছে র্যাশ হয়
শিশুর বয়স ১ বছরের কম
শিশুর রোগ প্রতিরোধক্ষমতা কম
আগে থেকেই জটিল রোগ আছে
চিকেন পক্স প্রতিরোধের উপায়
চিকেন পক্স প্রতিরোধের সবচেয়ে ভালো উপায় হলো সময়মতো টিকা নেওয়া। এই টিকা শিশুকে চিকেন পক্স থেকে অনেকটাই সুরক্ষা
দেয় এবং রোগ হলেও সাধারণত জটিলতা কমাতে সাহায্য করে। তাই শিশুর টিকাদান পরিকল্পনা নিয়ে শিশু বিশেষজ্ঞের সঙ্গে
আগে থেকেই কথা বলা ভালো।
সময়মতো চিকেন পক্স বা varicella vaccine দিতে হবে।
সাধারণত এই টিকার ২টি ডোজ সুপারিশ করা হয়।
প্রথম ডোজ সাধারণত ১২–১৫ মাস বয়সে দেওয়া হয়।
দ্বিতীয় ডোজ সাধারণত ৪–৬ বছর বয়সে দেওয়া হয়।
টিকা দেওয়ার আগে শিশুর বয়স, স্বাস্থ্য ও আগের টিকার ইতিহাস চিকিৎসককে জানাতে হবে।
শিশুর রোগ প্রতিরোধক্ষমতা কম হলে টিকা দেওয়ার আগে অবশ্যই ডাক্তারের পরামর্শ নিতে হবে।
আক্রান্ত শিশুকে অন্য শিশুদের থেকে আলাদা রাখতে হবে।
সব ফোস্কা শুকিয়ে খোসা না পড়া পর্যন্ত স্কুল বা ডে কেয়ারে পাঠানো উচিত নয়।
শিশুকে নিয়মিত হাত ধোয়ার অভ্যাস করাতে হবে।
তোয়ালে, কাপড়, বালিশ ও বিছানার চাদর আলাদা ব্যবহার করতে হবে।
ফোস্কা চুলকানো বা খোঁচানো থেকে শিশুকে বিরত রাখতে হবে।
ঘরে নবজাতক, গর্ভবতী নারী বা দুর্বল রোগ প্রতিরোধক্ষমতার কেউ থাকলে বাড়তি সতর্ক থাকতে হবে।
শিশুর চিকেন পক্স হলে ডা. সালাহউদ্দিন মাহমুদ এর পরামর্শ নিন
চিকেন পক্সে শিশুর জ্বর, চুলকানি, খাবারে অনীহা বা দুর্বলতা দেখা দিলে বিষয়টি অবহেলা করবেন না। বিশেষ করে শিশু
ছোট হলে, বারবার জ্বর এলে, ফোস্কায় ইনফেকশনের লক্ষণ থাকলে বা আগে থেকেই পেট, লিভার বা পুষ্টিজনিত সমস্যা থাকলে
একজন শিশু বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
শিশুর চিকেন পক্স নিয়ে অভিভাবকদের মনে অনেক প্রশ্ন থাকে, বিশেষ করে লক্ষণ, ছড়ানোর ঝুঁকি, চিকিৎসা ও টিকা নিয়ে।
এই প্রশ্নোত্তর অংশে প্রয়োজনীয় তথ্য তুলে ধরা হয়েছে, যাতে সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে সুবিধা হয়।
শিশুদের চিকেন পক্স সাধারণত ৭ থেকে ১০ দিনের মধ্যে ভালো হতে শুরু করে। প্রথম ১–২ দিন জ্বর, শরীর
ব্যথা, দুর্বলতা বা খাবারে অরুচি থাকতে পারে। এরপর শরীরে ছোট ছোট ফুসকুড়ি দেখা দেয়, যা ধীরে ধীরে পানি
ভর্তি দানায় পরিণত হয়। সাধারণত ৫–৭ দিনের মধ্যে নতুন ফুসকুড়ি ওঠা কমে যায়। ১০–১৪ দিনের মধ্যে বেশিরভাগ
ফুসকুড়ি শুকিয়ে খোসা পড়ে যায়। তবে চুলকানি, দাগ বা দুর্বলতা কিছু শিশুর ক্ষেত্রে আরও কয়েক দিন থাকতে
পারে। জ্বর বেশি হলে, ফুসকুড়িতে পুঁজ হলে, শিশু খুব দুর্বল হয়ে পড়লে বা শ্বাসকষ্ট হলে দ্রুত শিশু
বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
না, চিকেন পক্স হলে শিশুকে স্কুল, কোচিং বা ডে কেয়ারে পাঠানো উচিত নয়। কারণ এই রোগ খুব সহজে অন্য
শিশুদের মধ্যে ছড়াতে পারে। সাধারণত র্যাশ ওঠার আগের ১–২ দিন থেকে শুরু করে সব ফোস্কা শুকিয়ে খোসা না
পড়া পর্যন্ত শিশু সংক্রমণ ছড়াতে পারে। তাই শিশুকে ঘরে রেখে বিশ্রাম করানোই নিরাপদ।
চুলকানি কমাতে শিশুর নখ ছোট করে কেটে দিন, যাতে চুলকালে ত্বকে ক্ষত না হয়। ঢিলেঢালা সুতির কাপড় পরানো
ভালো, কারণ ঘাম হলে চুলকানি আরও বাড়তে পারে। শিশুকে ঠান্ডা ও আরামদায়ক পরিবেশে রাখুন। প্রয়োজন হলে
চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ক্যালামাইন লোশন বা চুলকানি কমানোর ওষুধ ব্যবহার করা যেতে পারে।
শিশুর জ্বর বেশি হলে, জ্বর দীর্ঘদিন থাকলে, শিশু খুব দুর্বল বা নিস্তেজ হয়ে পড়লে দ্রুত ডাক্তার দেখানো
উচিত। ফোস্কার চারপাশ অতিরিক্ত লাল, ফুলে যাওয়া, গরম লাগা বা পুঁজ বের হওয়া ইনফেকশনের লক্ষণ হতে পারে।
চোখের আশপাশে র্যাশ হলে, শ্বাসকষ্ট দেখা দিলে, বারবার বমি হলে বা শিশুর বয়স খুব কম হলে দেরি না করে
শিশু বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিতে হবে।
চিকেন পক্স প্রতিরোধে টিকা সবচেয়ে কার্যকর উপায়গুলোর একটি। টিকা শিশুকে রোগ থেকে সুরক্ষা দিতে সাহায্য
করে এবং টিকা নেওয়ার পরও যদি চিকেন পক্স হয়, সাধারণত রোগের তীব্রতা কম থাকে। এতে জ্বর, ফোস্কা ও
জটিলতার ঝুঁকি অনেক ক্ষেত্রে কমে যায়। শিশুর বয়স, স্বাস্থ্য অবস্থা ও আগের টিকার ইতিহাস অনুযায়ী টিকার
সময়সূচি জানতে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া ভালো।
দক্ষ শিশু বিশেষজ্ঞের পরামর্শ চান?
শিশুর সঠিক চিকিৎসার জন্য আজই ডা. সালাহউদ্দিন মাহমুদ-এ যোগাযোগ করুন।