বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরেই কলেরাপ্রবণ দেশ হিসেবে পরিচিত। বাংলাদেশে পরিচালিত একটি গবেষণায় প্রতিবছর
১ লাখের বেশি কলেরা রোগী হওয়ার সম্ভাব্য হিসাব উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এটি প্রতিবছরের সরকারি নিশ্চিত
রোগীর সংখ্যা নয়। অনেক রোগী পরীক্ষার বাইরে থেকে যাওয়ায় প্রকৃত সংখ্যা ও রিপোর্ট হওয়া সংখ্যার মধ্যে পার্থক্য
থাকতে পারে।
বাংলাদেশের বিভিন্ন হাসপাতালে পরিচালিত গবেষণাতেও বছরের বিভিন্ন সময়ে কলেরার জীবাণু পাওয়া গেছে। বিশেষ করে
বর্ষা, বন্যা, জলাবদ্ধতা এবং নিরাপদ পানির সংকট তৈরি হলে সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়তে পারে। তাই শিশুর হঠাৎ খুব বেশি
পানির মতো
পাতলা পায়খানা
শুরু হলে বিষয়টি অবহেলা করা উচিত নয়।
কলেরা মূলত Vibrio cholerae নামের এক ধরনের ব্যাকটেরিয়ার কারণে হওয়া তীব্র পানিবাহিত রোগ। এই রোগে সবচেয়ে
বড় ঝুঁকি হলো খুব অল্প সময়ে শরীর থেকে প্রচুর পানি ও প্রয়োজনীয় লবণ বেরিয়ে যাওয়া। বিশেষ করে ছোট শিশুর ক্ষেত্রে
দ্রুত পানিশূন্যতা তৈরি হলে পরিস্থিতি গুরুতর হয়ে যেতে পারে।
তবে আশার বিষয় হলো, সময়মতো ওআরএস এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা শুরু করা গেলে কলেরায় আক্রান্ত অধিকাংশ রোগীই সুস্থ হয়ে
ওঠে। CDC-এর তথ্য অনুযায়ী, সঠিক সময়ে পর্যাপ্ত পানি ও লবণের ঘাটতি পূরণ করা গেলে
৯৯ শতাংশের বেশি রোগী বেঁচে যান।
কলেরা হলো অন্ত্রের একটি তীব্র সংক্রমণ। সাধারণত কলেরার জীবাণু মিশে থাকা পানি বা খাবার খাওয়ার মাধ্যমে রোগটি
ছড়ায়। জীবাণু শরীরে প্রবেশ করার পর অন্ত্রে এমন একটি বিষাক্ত পদার্থ তৈরি করতে পারে, যার কারণে শরীর থেকে খুব
দ্রুত পানি ও প্রয়োজনীয় খনিজ লবণ বেরিয়ে যেতে থাকে। এ কারণেই কলেরার পায়খানা অনেক সময় সাধারণ ডায়রিয়ার তুলনায়
বেশি পরিমাণে ও ঘন ঘন হয়।
তবে সবার ক্ষেত্রে রোগের তীব্রতা একরকম হয় না। কারও খুব হালকা ডায়রিয়া হতে পারে। আবার কারও কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই
মারাত্মক পানিশূন্যতা দেখা দিতে পারে। CDC-এর হিসাবে, কলেরার জীবাণুতে আক্রান্ত প্রায় প্রতি ১০ জন মানুষের মধ্যে
একজনের গুরুতর উপসর্গ দেখা দিতে পারে।
প্রতি বছর কত মানুষ কলেরায় আক্রান্ত হয়?
কলেরার প্রকৃত আক্রান্তের সংখ্যা নির্ধারণ করা সহজ নয়। অনেক দেশে সব রোগীর পরীক্ষা হয় না। আবার অনেক রোগী
স্বাস্থ্যব্যবস্থার আওতায়ও আসেন না।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO)
এর হিসাব অনুযায়ী, বিশ্বে প্রতিবছর আনুমানিক
১৩ লাখ থেকে ৪০ লাখ মানুষ কলেরায় আক্রান্ত হতে পারেন। একই সময়ে প্রায়
২১ হাজার থেকে ১ লাখ ৪৩ হাজার মানুষের মৃত্যু হতে পারে।
আর সরকারি ও আন্তর্জাতিকভাবে রিপোর্ট হওয়া সংখ্যার দিকে তাকালে দেখা যায়, ২০২৫ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ২৮
ডিসেম্বর পর্যন্ত ৩৩টি দেশ থেকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার কাছে মোট
৬ লাখ ১৪ হাজার ৮২৮ জন কলেরা রোগী এবং ৭ হাজার ৫৯৮ জনের মৃত্যুর
তথ্য জানানো হয়েছিল। শিশুদের জন্য ডায়রিয়া আরও বড় স্বাস্থ্যঝুঁকি।
UNICEF-এর ২০২৬ সালের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪
সালে ডায়রিয়াজনিত রোগে পাঁচ বছরের কম বয়সী প্রায় ৩ লাখ ৭৪ হাজার শিশুর মৃত্যু হয়েছে। তবে এই সংখ্যার সব
মৃত্যু কলেরার কারণে নয়। এতে বিভিন্ন ধরনের ডায়রিয়াজনিত রোগ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
শিশুর কলেরা কেন হয়? প্রধান কারণসমূহ
কলেরার জীবাণু সাধারণত আক্রান্ত ব্যক্তির মলের মাধ্যমে পরিবেশে ছড়ায়। পরে সেই জীবাণু পানি বা খাবারে মিশে গেলে
এবং শিশু সেই খাবার বা পানি গ্রহণ করলে সংক্রমণ হতে পারে। শিশুর কলেরার ঝুঁকি বাড়তে পারে যেসব কারণে—
জীবাণুযুক্ত বা অনিরাপদ পানি পান করা
অপরিষ্কার হাতে খাবার খাওয়া
রাস্তার খোলা বা অস্বাস্থ্যকর খাবার খাওয়া
টয়লেট ব্যবহারের পর সাবান দিয়ে ভালোভাবে হাত না ধোয়া
শিশুর খাবার তৈরিতে দূষিত পানি ব্যবহার করা
রান্না করা খাবার অনেকক্ষণ খোলা রাখা
বন্যা বা জলাবদ্ধতার সময় দূষিত পানি ব্যবহার
অপর্যাপ্ত পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা
আক্রান্ত ব্যক্তির মল বা বমি পরিষ্কারের পর হাত না ধোয়া
অপরিষ্কার পাত্রে পানি বা খাবার সংরক্ষণ করা
নোট: কলেরা সাধারণত শুধু একজন রোগীর পাশে বসলে ছড়ায় না। মূল সমস্যা তৈরি হয় যখন রোগীর মল থেকে জীবাণু
পানি, খাবার বা হাতে পৌঁছে যায়। এই কারণে বিশুদ্ধ পানি, পরিষ্কার খাবার এবং হাত ধোয়ার অভ্যাস কলেরা প্রতিরোধের
সবচেয়ে কার্যকর উপায়গুলোর মধ্যে পড়ে।
শিশুর কলেরা রোগের প্রধান লক্ষণ কী কী?
কলেরার সবচেয়ে পরিচিত লক্ষণ হলো হঠাৎ শুরু হওয়া প্রচুর পানির মতো পাতলা পায়খানা। মনে রাখবেন, কলেরা হলে সবসময়
জ্বর থাকতেই হবে—বিষয়টি এমন নয়। তাই জ্বর না থাকলেও যদি প্রচুর পানির মতো পায়খানা হয়, তাহলে শিশুর শরীরে
পানিশূন্যতা হচ্ছে কি না সেটিই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। শিশুর ক্ষেত্রে আরও যেসব লক্ষণ দেখা যেতে পারে—
খুব ঘন ঘন পাতলা পায়খানা
পায়খানা একেবারে পানির মতো হয়ে যাওয়া
সাদা বা ভাত ধোয়া পানির মতো পায়খানা
বারবার বমি
প্রচণ্ড তৃষ্ণা
মুখ ও জিহ্বা শুকিয়ে যাওয়া
শিশু দুর্বল হয়ে পড়া
চোখ বসে যাওয়া
প্রস্রাব কমে যাওয়া
অস্থিরতা বা বিরক্তি
খুব বেশি ঘুম ঘুম ভাব
পেশিতে টান ধরা
হাত-পা ঠান্ডা হয়ে আসা
স্বাভাবিক খেলাধুলা বা নড়াচড়া কমে যাওয়া
কলেরার জীবাণু শরীরে ঢোকার কতদিন পর লক্ষণ দেখা দেয়?
সাধারণত কলেরার জীবাণু শরীরে প্রবেশের দুই থেকে তিন দিনের মধ্যে
লক্ষণ দেখা দিতে পারে। তবে কারও ক্ষেত্রে কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই উপসর্গ শুরু হয়। আবার কারও ক্ষেত্রে পাঁচ দিন
পর্যন্ত সময় লাগতে পারে। পরিবারের কারও কলেরা হলে তাই অন্য সদস্যদের, বিশেষ করে শিশুদের কয়েক দিন পর্যবেক্ষণে
রাখা দরকার।
শিশুর শরীরে পানিশূন্যতা হয়েছে কি না বুঝবেন কীভাবে?
কলেরার সবচেয়ে বিপজ্জনক দিক হলো দ্রুত শরীরে পানির ঘাটতি তৈরি হওয়া। শিশুর মধ্যে নিচের পরিবর্তনগুলো দেখলে
পানিশূন্যতার আশঙ্কা করতে হবে।
লক্ষণ
কী বোঝাতে পারে
খুব বেশি তৃষ্ণা
শরীরে পানির ঘাটতি শুরু হয়েছে
মুখ ও জিহ্বা শুকিয়ে যাওয়া
পানিশূন্যতার লক্ষণ
চোখ বসে যাওয়া
মাঝারি বা তীব্র পানিশূন্যতা
প্রস্রাব কমে যাওয়া
শরীরে তরল কমে যাচ্ছে
শিশু অস্থির বা বিরক্ত
পানিশূন্যতার প্রাথমিক লক্ষণ হতে পারে
খুব নিস্তেজ হয়ে যাওয়া
গুরুতর সতর্কসংকেত
হাত-পা ঠান্ডা হয়ে যাওয়া
রক্তসঞ্চালন কমে যাওয়ার ইঙ্গিত
অস্বাভাবিক দুর্বলতা
দ্রুত চিকিৎসা প্রয়োজন হতে পারে
নোট: গুরুতর কলেরায় একজন রোগী চিকিৎসা পাওয়ার আগেই শরীরের মোট ওজনের ১০ শতাংশের বেশি পানি হারাতে
পারেন। এ অবস্থায় চিকিৎসা না হলে রক্তচাপ মারাত্মকভাবে কমে যাওয়া, কিডনির সমস্যা, অচেতন হয়ে যাওয়া এমনকি
মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে।
বাংলাদেশে শিশুর কলেরা রোগের চিকিৎসা
বাংলাদেশে শিশুর কলেরার চিকিৎসার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো দ্রুত পানিশূন্যতা পূরণ করা। কলেরায় বারবার
পানির মতো পাতলা পায়খানা হলে শিশুর শরীর থেকে অল্প সময়ের মধ্যেই পানি ও প্রয়োজনীয় লবণ বের হয়ে যেতে পারে। তাই
চিকিৎসার শুরুতেই শিশুর পানিশূন্যতার মাত্রা বুঝে খাবার স্যালাইন, প্রয়োজন হলে শিরায় তরল এবং অন্যান্য সহায়ক
চিকিৎসা দিতে হয়।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশনা অনুযায়ী, শিশুর পানিশূন্যতার অবস্থা বিবেচনা করে চিকিৎসাকে সাধারণত
তিনটি পরিকল্পনায় ভাগ করা হয়—পানিশূন্যতা নেই, কিছুটা পানিশূন্যতা এবং তীব্র পানিশূন্যতা।
১. খাবার স্যালাইন ও তরল দিয়ে পানিশূন্যতা পূরণ
কলেরায় আক্রান্ত শিশুর চিকিৎসায় খাবার স্যালাইন বা ORS প্রধান ভূমিকা রাখে। শুধু পানি পান করানো যথেষ্ট
নয়, কারণ ডায়রিয়ার সঙ্গে শরীর থেকে লবণও বের হয়ে যায়।
পানিশূন্যতা না থাকলে বা খুব কম থাকলে: শিশুকে প্রতিবার পাতলা পায়খানার পর খাবার স্যালাইন দিতে হবে।
একবারে বেশি না দিয়ে অল্প অল্প করে বারবার খাওয়ানো ভালো। সাধারণভাবে—
২ বছরের কম বয়সী শিশুকে প্রায় ৫০–১০০ মিলি ORS
২ বছর বা তার বেশি বয়সী শিশুকে প্রায় ১০০–২০০ মিলি ORS
কিছুটা পানিশূন্যতা থাকলে: শিশুকে স্বাস্থ্যকেন্দ্র বা হাসপাতালের পর্যবেক্ষণে রেখে নির্দিষ্ট পরিমাণ
ORS দেওয়া প্রয়োজন হতে পারে। WHO-এর Plan B অনুযায়ী কিছু পানিশূন্যতা থাকলে প্রথম চার ঘণ্টায় শিশুর ওজন
অনুযায়ী প্রায় ৭৫ মিলি/কেজি ORS দেওয়া হয় এবং পরে আবার পানিশূন্যতার অবস্থা পরীক্ষা করা হয়।
শিশু স্যালাইন খাওয়ার সময় বমি করলে সাধারণত প্রায় ১০ মিনিট বিরতি দিয়ে আবার অল্প অল্প করে খাওয়ানো শুরু করা যায়।
তীব্র পানিশূন্যতা হলে: এটি জরুরি চিকিৎসার বিষয়। শিশুকে দ্রুত হাসপাতালে নিতে হবে। চিকিৎসক শিশুর অবস্থা
অনুযায়ী শিরায় তরল (IV fluid) দিয়ে দ্রুত পানিশূন্যতা পূরণ করবেন এবং সম্ভব হলে ORS-ও চালিয়ে যাবেন।
গুরুতর কলেরায় দ্রুত চিকিৎসা না হলে শিশুর অবস্থা অল্প সময়ের মধ্যেই সংকটাপন্ন হতে পারে।
২. কলেরায় আক্রান্ত শিশুকে জিঙ্ক দেওয়া
শিশুর তীব্র পানির মতো
ডায়রিয়ার চিকিৎসায়
ORS-এর পাশাপাশি জিঙ্ক ব্যবহার করা হয়। জিঙ্ক ডায়রিয়ার স্থায়িত্ব ও তীব্রতা কমাতে সাহায্য করতে পারে এবং
পরবর্তী সময়ে আবার ডায়রিয়া হওয়ার ঝুঁকিও কিছুটা কমায়। শিশুর বয়স ও শারীরিক অবস্থা অনুযায়ী সঠিক মাত্রার জন্য
চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। WHO-এর শিশু ডায়রিয়া ব্যবস্থাপনার নির্দেশনা অনুযায়ী সাধারণত—
৬ মাসের কম বয়সে: দৈনিক ১০ মি.গ্রা. জিঙ্ক
৬ মাস বা তার বেশি বয়সে: দৈনিক ২০ মি.গ্রা. জিঙ্ক
সাধারণত ১০–১৪ দিন, guideline ও চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী
৩. অ্যান্টিবায়োটিক কখন প্রয়োজন হতে পারে?
সব শিশুর কলেরায় অ্যান্টিবায়োটিক প্রয়োজন হয় না। অধিকাংশ ক্ষেত্রে দ্রুত ORS দিয়ে পানিশূন্যতা পূরণই মূল
চিকিৎসা। তবে তীব্র কলেরা বা গুরুতর পানিশূন্যতা হলে চিকিৎসক অ্যান্টিবায়োটিক দিতে পারেন। শিশুর ক্ষেত্রে কোন
অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করা হবে তা রোগের তীব্রতা, বয়স, ওজন এবং স্থানীয়ভাবে Vibrio cholerae-এর
অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধের ধরন দেখে নির্ধারণ করা উচিত।
বিভিন্ন cholera guideline-এ
azithromycin-সহ কয়েক ধরনের অ্যান্টিবায়োটিকের উল্লেখ রয়েছে। তাই শিশুকে নিজের সিদ্ধান্তে azithromycin,
ciprofloxacin বা অন্য কোনো অ্যান্টিবায়োটিক দেওয়া উচিত নয়।
৪. বুকের দুধ ও স্বাভাবিক খাবার চালিয়ে যেতে হবে
কলেরা বা পাতলা পায়খানা হয়েছে বলে শিশুর খাবার বন্ধ করা ঠিক নয়। ডায়রিয়ার চিকিৎসায় অতিরিক্ত তরল দেওয়ার পাশাপাশি
feeding চালিয়ে যাওয়ার পরামর্শও WHO-এর শিশু ব্যবস্থাপনার অংশ।
বুকের দুধ খাওয়া শিশু হলে বুকের দুধ চালিয়ে যেতে হবে।
বয়স অনুযায়ী ভাত, খিচুড়ি, পাকা কলা ও সহজপাচ্য স্বাভাবিক খাবার দেওয়া যেতে পারে।
অল্প অল্প করে বারবার খাবার দিন।
শিশুকে না খাইয়ে রাখলে দুর্বলতা ও অপুষ্টির ঝুঁকি বাড়তে পারে।
শিশুর কলেরা হলে কখন দ্রুত হাসপাতালে নিবেন?
WHO বিশেষভাবে severe diarrhoea, অতিরিক্ত vomiting, দুর্বলতা, ঝিমুনি বা পর্যাপ্ত তরল গ্রহণ করতে না পারলে
দ্রুত চিকিৎসাকেন্দ্রে যাওয়ার পরামর্শ দেয়। নিচের কোনো লক্ষণ থাকলে ঘরে চিকিৎসা চালিয়ে সময় নষ্ট না করে শিশুকে
দ্রুত নিকটস্থ হাসপাতাল বা চিকিৎসাকেন্দ্রে নিতে হবে—
খুব ঘন ঘন পানির মতো পায়খানা হচ্ছে
শিশু ORS বা অন্য তরল পান করতে পারছে না
বারবার বমি করছে
শিশু খুব দুর্বল বা অস্বাভাবিক ঘুমঘুম
চোখ বসে গেছে
প্রস্রাব অনেক কমে গেছে
দাঁড়াতে বা বসতে পারছে না
হাত-পা ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে
অতিরিক্ত তৃষ্ণা বা গুরুতর পানিশূন্যতার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে
নোট: তীব্র পানিশূন্যতার ক্ষেত্রে পরীক্ষা-নিরীক্ষার ফল পাওয়ার জন্য অপেক্ষা না করে প্রথম কাজ হলো
শরীরের পানি ও লবণের ঘাটতি পূরণ করা।
শিশুর কলেরা নিয়ে উদ্বিগ্ন?
দ্রুত সঠিক চিকিৎসা নিন!
শিশুর কলেরার ক্ষেত্রে পানিশূন্যতা রোধে দ্রুত প্রয়োজনীয় পরামর্শ নিন।
চিকিৎসার পাশাপাশি কলেরা প্রতিরোধে নিরাপদ পানি, খাবারের পরিচ্ছন্নতা এবং সঠিক স্যানিটেশন খুব গুরুত্বপূর্ণ।
ফুটানো বা নিরাপদ পানি পান করান
খাবার তৈরির আগে এবং শিশুকে খাওয়ানোর আগে সাবান দিয়ে হাত ধুয়ে নিন
টয়লেট ব্যবহারের পর ভালোভাবে হাত ধুতে হবে
বাসি বা অস্বাস্থ্যকর খাবার শিশুকে দেবেন না
শিশুর খাবার ও পানির পাত্র পরিষ্কার রাখুন
এলাকায় কলেরার ঝুঁকি থাকলে স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা অনুসরণ করুন
উপযুক্ত ক্ষেত্রে মুখে খাওয়ার কলেরা টিকা (OCV) কলেরা প্রতিরোধ ও প্রাদুর্ভাব নিয়ন্ত্রণে সহায়ক হতে
পারে
কলেরা হলে শিশুকে কী খাওয়াবেন?
ডায়রিয়া হলে শিশুকে না খাইয়ে রাখার কোনো প্রয়োজন নেই। বয়স অনুযায়ী তার স্বাভাবিক খাবার চালিয়ে যেতে হবে। বুকের
দুধ খাওয়া শিশু হলে বুকের দুধ অবশ্যই চালিয়ে যেতে হবে। অন্যদিকে কোমল পানীয়, অতিরিক্ত মিষ্টি জুস বা খুব বেশি
চিনিযুক্ত পানীয়কে ওআরএসের বিকল্প হিসেবে দেওয়া ঠিক নয়। এগুলোতে অতিরিক্ত চিনি থাকায় কিছু ক্ষেত্রে পাতলা
পায়খানা আরও বেড়ে যেতে পারে। খাওয়ানো যেতে পারে—
নরম ভাত
পাতলা খিচুড়ি
আলু
কলা
ডাল
শিশুর বয়স অনুযায়ী ঘরে তৈরি স্বাভাবিক খাবার
শিশুর কলেরা হলে যেসব ভুল করবেন না
কলেরা বা তীব্র ডায়রিয়ায় কিছু সাধারণ ভুল পরিস্থিতিকে আরও খারাপ করে দিতে পারে। তাই—
চিকিৎসকের কাছে যাওয়ার আগে ওআরএস দিতে দেরি করবেন না।
পাতলা পায়খানা বন্ধ করার জন্য নিজের সিদ্ধান্তে ওষুধ দেবেন না।
ফার্মেসি থেকে নিজে অ্যান্টিবায়োটিক কিনে দেবেন না।
শিশুকে না খাইয়ে রাখবেন না।
বুকের দুধ বন্ধ করবেন না।
কোমল পানীয় বা ফলের জুসকে ওআরএসের বিকল্প ভাববেন না।
পায়খানা কিছুটা কমেছে বলে পানিশূন্যতার লক্ষণ উপেক্ষা করবেন না।
গুরুতর পানিশূন্যতা হলে শুধু ঘরে ওআরএস দিয়ে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করবেন না।
সাধারণ ডায়রিয়া আর কলেরা কি একই?
না। সব ডায়রিয়া কলেরা নয়। ভাইরাস, বিভিন্ন ধরনের ব্যাকটেরিয়া, দূষিত খাবার, খাদ্যে অসহিষ্ণুতা বা অন্ত্রের অন্য
সমস্যার কারণেও শিশুদের পাতলা পায়খানা হতে পারে। কলেরায় সাধারণত খুব দ্রুত এবং প্রচুর পানির মতো পায়খানা হওয়ার
প্রবণতা থাকে। এতে শরীর থেকে দ্রুত পানি ও লবণ বেরিয়ে যায়।
তবে শুধু পায়খানার ধরন দেখে নিশ্চিতভাবে বলা যায় না যে শিশুর কলেরা হয়েছে। প্রয়োজনে চিকিৎসক শিশুর শারীরিক
অবস্থা, পানিশূন্যতার মাত্রা, পায়খানার ধরন এবং অন্য লক্ষণ দেখে পরীক্ষা করার পরামর্শ দিতে পারেন।
শিশুর ডায়রিয়া ও পেটের সমস্যায় বিশেষজ্ঞ
ডা. সালাহউদ্দিন মাহমুদ এর পরামর্শ নিন
শিশুর বারবার ডায়রিয়া, বমি, পেটব্যথা, হজমের সমস্যা, খাবারে অনীহা, ওজন না বাড়া বা পুষ্টিজনিত সমস্যা হলে শুধু
উপসর্গ কমানোই যথেষ্ট নয়। সমস্যার পেছনের কারণটি সঠিকভাবে মূল্যায়ন করাও জরুরি।
ডা. সালাহউদ্দিন মাহমুদ
শিশু
গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজি, হেপাটোলজি ও
পুষ্টিবিষয়ক রোগের মূল্যায়ন ও চিকিৎসা করে থাকেন। শিশুদের দীর্ঘদিনের বা বারবার ডায়রিয়া হওয়া, পেট ও হজমের
সমস্যা,
লিভারের রোগ
এবং পুষ্টিজনিত জটিলতার ক্ষেত্রে তার পরামর্শ নেওয়া যেতে পারে।
তবে শিশুর প্রচুর পানির মতো পায়খানা, তীব্র পানিশূন্যতা, বারবার বমি, অতিরিক্ত দুর্বলতা বা অচেতনভাব দেখা দিলে
অপেক্ষা না করে আগে নিকটস্থ হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নিয়ে যান।
জরুরি অবস্থা না থাকলে শিশুর পেট, হজম ও পুষ্টিজনিত সমস্যার সঠিক মূল্যায়নের জন্য অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিন।
শিশুর কলেরায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া। হঠাৎ বারবার পানির মতো পাতলা পায়খানা শুরু হলে
“আরেকটু দেখি” বলে বসে না থেকে ওআরএস দেওয়া শুরু করুন। একই সঙ্গে শিশুর চোখ, মুখ, প্রস্রাব, তৃষ্ণা, আচরণ এবং
দুর্বলতার দিকে খেয়াল রাখুন। কলেরা প্রতিরোধযোগ্য এবং চিকিৎসাযোগ্য রোগ। কিন্তু ছোট শিশুর শরীরে পানিশূন্যতা খুব
দ্রুত বাড়তে পারে। তাই প্রচুর পাতলা পায়খানা,
বারবার বমি, প্রস্রাব কমে যাওয়া বা
শিশুকে খুব নিস্তেজ দেখলে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়াই নিরাপদ।
শিশুর কলেরা নিয়ে অভিভাবকদের অনেক প্রশ্ন থাকে—কখন ORS দিতে হবে, কখন হাসপাতালে নিতে হবে, জিঙ্ক বা
অ্যান্টিবায়োটিক দরকার কি না, আর কীভাবে পানিশূন্যতা বোঝা যাবে। নিচে এসব সাধারণ প্রশ্নের সংক্ষিপ্ত ও সহজ
উত্তর দেওয়া হলো।
কলেরার প্রধান চিকিৎসা হলো দ্রুত শরীরের হারানো পানি ও লবণ পূরণ করা। এজন্য খাবার স্যালাইন (ORS) দেওয়া
হয়। তীব্র পানিশূন্যতা হলে হাসপাতালে শিরায় তরল দিতে হতে পারে, আর গুরুতর ক্ষেত্রে চিকিৎসক
অ্যান্টিবায়োটিক দিতে পারেন।
শিশুর পানির মতো পায়খানা শুরু হলে দ্রুত খাবার স্যালাইন দিতে হবে এবং বুকের দুধ ও স্বাভাবিক খাবার
চালিয়ে যেতে হবে। শিশুর চোখ বসে যাওয়া, অতিরিক্ত দুর্বলতা, বারবার বমি, প্রস্রাব কমে যাওয়া বা পানি পান
করতে না পারার মতো লক্ষণ থাকলে দ্রুত হাসপাতালে নিতে হবে।
কলেরা হলে খাবার স্যালাইন ও নিরাপদ পানি নিয়মিত দিতে হবে। শিশু হলে বুকের দুধ বন্ধ করা যাবে না এবং বয়স
অনুযায়ী ভাত, খিচুড়ি, কলা ও অন্যান্য স্বাভাবিক সহজপাচ্য খাবার চালিয়ে যেতে হবে।
কলেরা রোগের জীবাণুর নাম Vibrio cholerae। এর O1 ও O139 সেরোগ্রুপ কলেরার প্রাদুর্ভাব ঘটাতে
পারে, তবে সাম্প্রতিক অধিকাংশ outbreak-এর সঙ্গে O1 যুক্ত।
কলেরার প্রধান লক্ষণ হলো হঠাৎ প্রচুর পানির মতো পাতলা পায়খানা, বমি, অতিরিক্ত তৃষ্ণা, দুর্বলতা এবং
দ্রুত পানিশূন্যতা। প্রতিকারে দ্রুত ORS শুরু করতে হবে, নিরাপদ পানি ও খাবার ব্যবহার করতে হবে এবং
গুরুতর লক্ষণ দেখা দিলে হাসপাতালে নিতে হবে।
কলেরার মূল চিকিৎসা কোনো নির্দিষ্ট ওষুধ নয়, বরং
ORS দিয়ে দ্রুত রিহাইড্রেশন। গুরুতর কলেরায় চিকিৎসক রোগীর বয়স, অবস্থা ও স্থানীয় অ্যান্টিবায়োটিক
সংবেদনশীলতা বিবেচনা করে অ্যান্টিবায়োটিক দিতে পারেন; নিজের সিদ্ধান্তে অ্যান্টিবায়োটিক খাওয়া উচিত নয়।
ডায়রিয়া বিভিন্ন ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া, পরজীবী বা অন্যান্য কারণে হতে পারে। অন্যদিকে কলেরা বিশেষভাবে
Vibrio cholerae
সংক্রমণের কারণে হয় এবং এতে অল্প সময়ের মধ্যে প্রচুর পানির মতো পায়খানা ও মারাত্মক পানিশূন্যতা দেখা
দিতে পারে।
কলেরা প্রতিরোধে ব্যবহৃত মুখে খাওয়ার টিকাকে
ওরাল কলেরা ভ্যাকসিন (OCV) বলা হয়। নিরাপদ পানি, স্যানিটেশন ও স্বাস্থ্যবিধির পাশাপাশি এই টিকা
কলেরা প্রতিরোধ ও outbreak নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
শিশুর কলেরা সমস্যায় বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন
কলেরার লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত অভিজ্ঞ শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. সালাহউদ্দিন মাহমুদ এর পরামর্শ নিন।
সতর্কতাঃ
ওয়েবসাইটে প্রকাশিত তথ্যসমূহ শুধুমাত্র সচেতনতা ও শিক্ষামূলক উদ্দেশ্যে প্রকাশিত। এটি কোনোভাবেই চিকিৎসা পরামর্শের বিকল্প নয়। চিকিৎসা সংক্রান্ত যেকোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে অবশ্যই একজন বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের পরামর্শ গ্রহণ করুন।