শিশুদের খাবারে সীসার দূষণ:
কারণ, ক্ষতিকর প্রভাব ও প্রতিরোধ
শিশুর জন্য প্রতিদিন ঘরে রান্না করা খাবারই বেছে নেন বেশির ভাগ মা-বাবা। ভাত, ডাল, সবজি, মাছ কিংবা
ডিম। খাবারগুলো পুষ্টিকর হলেও রান্নায় ব্যবহৃত কিছু উপকরণ বা বাসনপত্র থেকে ক্ষতিকর সীসা
(Lead) শিশুর শরীরে প্রবেশ করতে পারে। সবচেয়ে চিন্তার বিষয়, খাবারে সীসা আছে কি না, তা
সাধারণত স্বাদ, গন্ধ বা রং দেখে বোঝা যায় না। বাংলাদেশে শিশুদের সীসা দূষণ এখন বড় জনস্বাস্থ্য
সমস্যা।
UNICEF-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জাতীয় জরিপে প্রায় ৩৮ শতাংশ শিশুর রক্তে
উদ্বেগজনক মাত্রায় সীসা পাওয়া গেছে। এর পেছনে খাবার ছাড়াও দূষিত মাটি, ধুলাবালি, রং ও
শিল্পবর্জ্যের ভূমিকা রয়েছে। সীসা দূষণ শিশুদের মস্তিষ্কের বিকাশ, শেখার ক্ষমতা ও শারীরিক বৃদ্ধিতে
দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে। অথচ অনেক সময় শিশুর শরীরে সীসা জমলেও কোনো স্পষ্ট লক্ষণ দেখা যায়
না।
শিশুদের খাবারে সীসার দূষণ কেন হয়? কোন খাবার ও উপকরণে ঝুঁকি বেশি? সীসা শরীরে প্রবেশ করলে শিশুর
স্বাস্থ্যে কী ধরনের ক্ষতি হতে পারে? আর এই দূষণ থেকে শিশুকে সুরক্ষিত রাখতে অভিভাবকদের কী করা
উচিত? চলুন, গবেষণাভিত্তিক তথ্যের আলোকে বিষয়গুলো বিস্তারিত জেনে নিই।
সীসা (Lead বা Pb) একটি বিষাক্ত ভারী ধাতু। এটি খাবার, পানীয়, ধুলাবালি বা দূষিত পরিবেশের মাধ্যমে
শরীরে প্রবেশ করতে পারে। দীর্ঘদিন সীসার সংস্পর্শে থাকলে শরীরের বিভিন্ন অঙ্গের ক্ষতি হয়। বিশেষ
করে
মস্তিষ্ক, স্নায়ুতন্ত্র, কিডনি এবং রক্ত তৈরির স্বাভাবিক প্রক্রিয়া ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। শিশুদের
ক্ষেত্রে ঝুঁকি বেশি। কারণ তাদের মস্তিষ্ক ও স্নায়ুতন্ত্র তখনও বিকশিত হচ্ছে। প্রাপ্তবয়স্কদের
তুলনায় ছোট শিশুরা খাবারের সঙ্গে প্রবেশ করা সীসা বেশি শোষণ করতে পারে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO)
জানিয়েছে, রক্তে সীসার কোনো
মাত্রাকেই সম্পূর্ণ নিরাপদ বলা যায় না। এমনকি কম মাত্রার সীসাও শিশুদের বুদ্ধিবৃত্তিক
বিকাশ, আচরণ ও শেখার ক্ষমতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। আরেকটি সমস্যা হলো,
সীসা
বিষক্রিয়া
অনেক সময় নীরবে ঘটে। শিশুর শরীরে সীসা জমলেও প্রথম দিকে স্পষ্ট কোনো লক্ষণ নাও দেখা যেতে পারে।
বাংলাদেশে শিশুদের সীসা দূষণের পরিস্থিতি
বাংলাদেশে সীসা দূষণ নিয়ে বেশ কিছু গবেষণা হয়েছে। সাম্প্রতিক জাতীয় জরিপের ফলাফলও উদ্বেগজনক।
বাংলাদেশ
মাল্টিপল ইন্ডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভে (MICS ২০২৫)-এ ১২ থেকে ৫৯ মাস বয়সী ১১
হাজারের
বেশি শিশুর রক্ত পরীক্ষা করা হয়। UNICEF-এর প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী:
প্রায় ৩৮ শতাংশ শিশুর রক্তে সীসার মাত্রা ৫ µg/dL বা তার বেশি।
ঢাকায় জরিপে অংশ নেওয়া শিশুদের প্রায় ৬৫ শতাংশের রক্তে এই মাত্রার সীসা পাওয়া গেছে।
জরিপে শিশুদের গড় রক্তের সীসার মাত্রা ছিল প্রায় ৫.২১ µg/dL।
এখানে µg/dL অর্থ প্রতি ডেসিলিটার রক্তে কত মাইক্রোগ্রাম সীসা রয়েছে। এগুলো শিশুদের সার্বিক সীসা
সংস্পর্শের তথ্য। শুধু খাবার পরীক্ষা করে এই ফলাফল পাওয়া যায়নি। তাই সব শিশুর রক্তে সীসা বৃদ্ধির
কারণ ভেজাল খাবার, এমনটা বলা ঠিক হবে না। তবে বাংলাদেশের খাদ্য সরবরাহব্যবস্থায় সীসা দূষণের
প্রমাণও
রয়েছে। বিশেষ করে হলুদে বিষাক্ত রং মেশানোর বিষয়টি গবেষণায় উঠে এসেছে।
বাংলাদেশের হলুদে সীসার দূষণ নিয়ে গবেষণা
২০১৯ সালে
Environmental Research জার্নালে প্রকাশিত একটি গবেষণায় বাংলাদেশের হলুদে
সীসাযুক্ত
ক্রোমেট রঞ্জক (Lead Chromate) মেশানোর প্রমাণ পাওয়া যায়। হলুদকে বেশি উজ্জ্বল দেখানোর জন্য কিছু
অসাধু ব্যবসায়ী এই ক্ষতিকর রঞ্জক ব্যবহার করতেন। পরবর্তী সময়ে খাদ্যনিরাপত্তা কর্তৃপক্ষের অভিযান,
গবেষণা ও জনসচেতনতামূলক কার্যক্রমে পরিস্থিতির উন্নতি হয়।
২০২৩ সালে প্রকাশিত একটি গবেষণায় দেখা যায়, পর্যবেক্ষণ করা বাজারে হলুদের নমুনায় সীসা শনাক্তের
হার
২০১৯ সালের ৪৭ শতাংশ থেকে ২০২১ সালে শূন্যে নেমে এসেছিল। এটি অবশ্যই ইতিবাচক অগ্রগতি। তবে নির্দিষ্ট
সময় ও স্থানের নমুনার ফলাফল দিয়ে বর্তমানে দেশের সব হলুদ সীসামুক্ত, এমন নিশ্চয়তা দেওয়া যায়
না।
বাংলাদেশের শিশুখাদ্যে সীসা ও অন্যান্য ভারী ধাতুর উপস্থিতি
বাংলাদেশে বিক্রি হওয়া কিছু জনপ্রিয় প্রক্রিয়াজাত খাবারে উদ্বেগজনক মাত্রায় ভারী ধাতুর উপস্থিতি
পাওয়া গেছে। ২০২৬ সালে
Journal of Food
Composition and Analysis-এ প্রকাশিত এক গবেষণায় বাজারের ৩২টি খাদ্যপণ্যের নমুনা
পরীক্ষা করা হয়। এর মধ্যে ছিল বিস্কুট, কেক, ক্রিম রোল, চকলেট, বিভিন্ন পানীয় ও অন্যান্য
প্রক্রিয়াজাত খাবার। গবেষণায় কয়েকটি নমুনায় সীসা, ক্রোমিয়াম, নিকেল ও তামাসহ বিভিন্ন ভারী
ধাতুর
উপস্থিতি শনাক্ত করা হয়।
বিশেষ করে ক্রিম রোলের একটি নমুনায় সীসার পরিমাণ ছিল ৩৫.৭০ মিলিগ্রাম/কেজি এবং ক্রোমিয়ামের পরিমাণ
ছিল ৩৫.৩৯ মিলিগ্রাম/কেজি। শিশুদের সম্ভাব্য স্বাস্থ্যঝুঁকিও মূল্যায়ন করেন গবেষকেরা। পরীক্ষিত
৩২টি
পণ্যের মধ্যে ৩১টির ক্ষেত্রে শিশুদের সম্মিলিত অ-ক্যানসার স্বাস্থ্যঝুঁকির সূচক (Hazard Index)
গ্রহণযোগ্য সীমা ছাড়িয়েছিল। তবে এই সূচক সরাসরি কোনো রোগ হয়েছে, এমন প্রমাণ নয়। প্রতিবেদনে
উল্লেখিত
গবেষণার ফলাফল অনুযায়ী:
ক্রিম রোল: সীসা প্রায় ৩৫৭ গুণ বেশি
মিল্ক চকলেট: সীসা প্রায় ২৯৫ গুণ বেশি
লিচুর জুস (পানীয়): সীসা প্রায় ২২৯ গুণ বেশি
কৃত্রিম ফ্লেভারযুক্ত আমের জুস: ক্রোমিয়াম প্রায় ৫৯৪ গুণ বেশি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ
করা
হয়েছে
মনে রাখতে হবে, গবেষণার ফলাফল নির্দিষ্ট নমুনার ভিত্তিতে পাওয়া। তাই বাংলাদেশের সব বিস্কুট,
চকলেট বা পানীয় একইভাবে দূষিত, এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া যাবে না।
শিশুদের খাবারে সীসা দূষণের প্রধান ৬টি কারণ
সীসা খাবারের কোনো স্বাভাবিক পুষ্টি উপাদান নয়। তবে খাদ্য উৎপাদন, প্রক্রিয়াজাতকরণ, পরিবহন,
সংরক্ষণ
কিংবা রান্নার বিভিন্ন পর্যায়ে এটি খাবারে মিশতে পারে। বিশেষ করে ভেজাল মশলা, দূষিত মাটি ও পানি,
অনিরাপদ রান্নার পাত্র এবং খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণের যন্ত্রপাতি থেকে সীসা দূষণের ঝুঁকি তৈরি হয়।
অনেক সময় খাবার দেখতে একেবারে স্বাভাবিক থাকলেও তাতে সীসা থাকতে পারে। শিশুদের খাবারে সীসা দূষণের
প্রধান ছয়টি কারণ নিচে তুলে ধরা হলো।
১. ভেজাল হলুদ ও গুঁড়া মশলা
বাংলাদেশে সীসা দূষণের একটি পরিচিত উৎস হলো ভেজাল হলুদ। কিছু ক্ষেত্রে হলুদের রং উজ্জ্বল করতে
সীসাযুক্ত রঞ্জক ব্যবহার করা হয়েছে। শুধু হলুদ নয়, অনিরাপদ উৎপাদন বা প্রক্রিয়াজাতকরণের কারণে
অন্যান্য গুঁড়া মশলাতেও
ভারী ধাতুর
দূষণ
ঘটতে পারে। তাই অতিরিক্ত উজ্জ্বল রং দেখে মশলার মান বিচার করবেন না। পরিচিত ও নির্ভরযোগ্য উৎস থেকে
মশলা কিনুন।
২. দূষিত মাটিতে উৎপাদিত শাকসবজি
কলকারখানা, ব্যাটারি রিসাইক্লিং বা অন্যান্য শিল্পবর্জ্য থেকে সীসা মাটিতে জমতে পারে। সেই মাটিতে
উৎপাদিত কৃষিপণ্য দূষিত হওয়ার ঝুঁকিতে থাকে। এ ছাড়া সবজির গায়ে সীসাযুক্ত মাটি ও ধুলাবালি লেগে
থাকতে পারে। শাকসবজি ভালোভাবে ধোয়া জরুরি। তবে মনে রাখতে হবে, সবজির ভেতরে সীসা জমে থাকলে শুধু
ধোয়ার মাধ্যমে তা পুরোপুরি দূর করা সম্ভব নয়।
৩. অনিরাপদ রান্নার বাসনপত্র
কিছু পুনর্ব্যবহৃত ধাতু দিয়ে তৈরি বাসন এবং সীসাযুক্ত গ্লেজ ব্যবহার করা সিরামিক পাত্র থেকে খাবারে
সীসা মিশতে পারে। বিশেষ করে অনিরাপদ পাত্রে টক বা অ্যাসিডযুক্ত খাবার রান্না ও দীর্ঘ সময় সংরক্ষণ
করলে সীসা খাবারে চলে আসার ঝুঁকি বাড়তে পারে। সব অ্যালুমিনিয়াম বা সিরামিক পাত্র ক্ষতিকর নয়।
সমস্যা
মূলত সীসা থাকা উপকরণ এবং অনিরাপদ উৎপাদনপ্রক্রিয়ায়।
৪. সীসাযুক্ত পানি
পুরোনো সীসাযুক্ত পাইপ, সংযোগস্থল বা প্লাম্বিংয়ের কিছু উপকরণ থেকে পানিতে সীসা মিশতে পারে। শিশুর
দুধ, স্যুপ, খিচুড়ি কিংবা অন্য খাবার তৈরিতে সেই পানি ব্যবহার করলে সীসা শরীরে প্রবেশের সুযোগ তৈরি
হয়। পানি ফুটিয়ে জীবাণু ধ্বংস করা যায়, কিন্তু ফুটিয়ে সীসা দূর করা যায় না। পানিতে সীসা
থাকার সন্দেহ হলে পরীক্ষিত নিরাপদ পানির ব্যবস্থা করতে হবে।
৫. খাবার তৈরির জায়গায় দূষিত ধুলাবালি
শিল্পকারখানা, পুরোনো সীসাযুক্ত রং এবং ব্যাটারির বর্জ্য থেকে সীসাযুক্ত ধুলা তৈরি হতে পারে। এই
ধুলা রান্নাঘরের তাক, মেঝে, খাবারের পাত্র কিংবা শিশুর হাতে জমতে পারে। শিশুরা হাত মুখে দেওয়ার
কারণেও সীসা গ্রহণ করতে পারে। বিশেষ করে যেখানে অনিরাপদভাবে পুরোনো ব্যাটারি ভাঙা বা পুনর্ব্যবহার
করা হয়, তার আশপাশের পরিবেশে ঝুঁকি বেশি থাকতে পারে।
৬. অনিরাপদ খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ ও সংরক্ষণ
খাবার তৈরির পর শুধু পরিষ্কার প্যাকেটে রাখলেই তা নিরাপদ হয় না। শিশুদের পছন্দের অনেক খাবার তৈরি
হয়
ছোট-বড় কারখানায়। তবে সব কারখানায় খাদ্যনিরাপত্তার নিয়ম মেনে চলা হয় না।
Jamuna TV-র
অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে
ঢাকার উত্তরখান, সাভার ও কেরানীগঞ্জের কয়েকটি কারখানায় অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে কেক, বিস্কুট, জুস ও
চকলেট তৈরির চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। প্রতিবেদনে কিছু কারখানার অনুমোদন, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও
খাদ্যমান নিয়ন্ত্রণের ঘাটতির কথাও তুলে ধরা হয়।
খাবার তৈরির কাঁচামাল, দূষিত পানি, যন্ত্রপাতি কিংবা প্যাকেটজাতকরণের বিভিন্ন পর্যায়ে সীসাসহ ভারী
ধাতু মিশতে পারে। আবার পরিচিত ব্র্যান্ডের নকল মোড়ক ব্যবহার করেও অনিরাপদ খাবার বাজারজাত করার
অভিযোগ রয়েছে। তাই শুধু আকর্ষণীয় প্যাকেট বা পরিচিত ব্র্যান্ডের নাম দেখে খাবার নিরাপদ মনে করা
ঠিক
নয়।
শিশুর খাবারের নিরাপত্তা নিয়ে চিন্তিত?
বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নিন!
শিশুর পুষ্টি, হজম ও শারীরিক বৃদ্ধি নিয়ে উদ্বেগ থাকলে অভিজ্ঞ শিশু বিশেষজ্ঞের কাছ থেকে সঠিক
পরামর্শ নিন।
সীসা বিষক্রিয়া শুধু পেটের সমস্যা নয়। এটি শিশুর শারীরিক বৃদ্ধি, মস্তিষ্কের বিকাশ ও ভবিষ্যতের
শেখার ক্ষমতার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
মস্তিষ্ক ও স্নায়ুতন্ত্রের ক্ষতি
শিশুদের সীসা দূষণের সবচেয়ে গুরুতর প্রভাব পড়ে মস্তিষ্কে। সীসা স্নায়ুকোষের স্বাভাবিক কাজ ব্যাহত
করতে পারে। কিছু ক্ষেত্রে এই ক্ষতি দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে। বিশেষ করে অল্প বয়সে দীর্ঘদিন সীসার
সংস্পর্শে থাকলে ঝুঁকি বেশি। এর ফলে দেখা দিতে পারে:
বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশে বাধা
মনোযোগ ধরে রাখতে অসুবিধা
স্মৃতিশক্তি ও শেখার ক্ষমতা কমে যাওয়া
আচরণগত সমস্যা
ভাষা ও বিকাশের বিভিন্ন ধাপে দেরি
রক্তশূন্যতা বা অ্যানিমিয়া
সীসা শরীরে হিমোগ্লোবিন তৈরির প্রক্রিয়ায় বাধা দিতে পারে। ফলে শিশুর রক্তশূন্যতা দেখা দিতে পারে।
এ
ধরনের সমস্যায় শিশু দুর্বল হয়ে পড়তে পারে। সহজে ক্লান্ত হওয়া, ফ্যাকাশে দেখানো কিংবা স্বাভাবিক
কাজকর্মে আগ্রহ কমে যাওয়ার মতো লক্ষণ দেখা যেতে পারে। তবে সব রক্তশূন্যতার কারণ সীসা নয়। আয়রনের
ঘাটতিসহ আরও অনেক কারণে শিশুদের অ্যানিমিয়া হয়।
পেটব্যথা ও হজমের সমস্যা
শিশুর শরীরে সীসার পরিমাণ বেড়ে গেলে হজমের বিভিন্ন সমস্যা দেখা দিতে পারে। শিশুর দীর্ঘদিন
কোষ্ঠকাঠিন্য থাকলে এর অন্য কারণও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। এ বিষয়ে
শিশুদের কোষ্ঠকাঠিন্যের
চিকিৎসা
সম্পর্কে বিস্তারিত পড়তে পারেন। কিছু শিশু খাবারের প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলে। তবে এসব লক্ষণ সাধারণ
হজমের সমস্যা বা অন্য রোগের কারণেও হতে পারে। তাই শুধু লক্ষণ দেখে সীসা বিষক্রিয়া নিশ্চিত করা যায়
না।
প্রয়োজনে রক্ত পরীক্ষা করতে হয়। শিশুর বারবার পেটব্যথা, বমি বা হজমের সমস্যা হলে
শিশু পরিপাকতন্ত্রের
রোগ ও চিকিৎসা
সম্পর্কে জেনে নিতে পারেন। তবে এসব লক্ষণ থাকলেই সীসা বিষক্রিয়া হয়েছে, এমন নয়।
শারীরিক বৃদ্ধি ব্যাহত হওয়া
দীর্ঘদিন সীসার সংস্পর্শে থাকলে শিশুর স্বাভাবিক শারীরিক বৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হতে পারে। বয়স অনুযায়ী
উচ্চতা ও ওজন বৃদ্ধিতে সমস্যা দেখা দিতে পারে। বিশেষ করে শিশুর শরীরে আয়রন বা ক্যালসিয়ামের ঘাটতি
থাকলে সীসা শোষণের ঝুঁকি বাড়তে পারে। অপুষ্টিতে ভোগা শিশুদের ক্ষেত্রে এই সমস্যা আরও উদ্বেগজনক।
তাই
শিশুর নিয়মিত বৃদ্ধি পর্যবেক্ষণ এবং সুষম খাবার নিশ্চিত করা জরুরি। প্রয়োজন অনুযায়ী
শিশুদের অপুষ্টি ও
পুষ্টিজনিত সমস্যার চিকিৎসা
নেওয়া যেতে পারে।
কিডনি ও অন্যান্য অঙ্গের ক্ষতি
সীসা শুধু মস্তিষ্ক বা হজমের সমস্যাই তৈরি করে না, কিডনির স্বাভাবিক কার্যক্ষমতাও ক্ষতিগ্রস্ত করতে
পারে। দীর্ঘদিন বা উচ্চমাত্রায় সীসার সংস্পর্শে থাকলে কিডনির কার্যক্রমে সমস্যা দেখা দেওয়ার ঝুঁকি
থাকে। গুরুতর সীসা বিষক্রিয়ায় স্নায়ুতন্ত্র আক্রান্ত হয়ে খিঁচুনি, অস্বাভাবিক আচরণ, অতিরিক্ত
ঘুমঘুম
ভাব কিংবা চেতনা হারানোর মতো পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। এসব গুরুতর লক্ষণ দেখা দিলে শিশুকে দ্রুত
হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নিতে হবে।
শিশুদের সীসা দূষণ নিয়ে ডা. সালাহউদ্দিন মাহমুদের সতর্কতা
Jamuna TV-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ডা. সালাহউদ্দিন মাহমুদ শিশুদের খাবারে সীসা, ক্রোমিয়াম ও নিকেলের
মতো ভারী ধাতুর উপস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি জানান, সীসার কোনো নিরাপদ মাত্রা নেই। অল্প
পরিমাণে দীর্ঘদিন সীসার সংস্পর্শে থাকলেও শিশুর স্নায়ুতন্ত্রের স্বাভাবিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হতে
পারে।
তিনি আরও জানান, দীর্ঘদিন ভারী ধাতুর সংস্পর্শে থাকলে লিভার, কিডনি ও স্নায়ুতন্ত্রের ক্ষতি হতে
পারে। কিছু ভারী ধাতুর নির্দিষ্ট রাসায়নিক রূপ দীর্ঘমেয়াদি সংস্পর্শে ক্যানসারের ঝুঁকিও বাড়াতে
পারে। তবে সব ভারী ধাতুর স্বাস্থ্যপ্রভাব এক নয়। ক্ষতির ধরন ও মাত্রা নির্ভর করে সংশ্লিষ্ট ধাতু,
শরীরে প্রবেশের পরিমাণ এবং কতদিন সংস্পর্শে থাকা হচ্ছে, তার ওপর।
শিশুদের সীসা বিষক্রিয়ার লক্ষণ কী কী?
শিশুর শরীরে সীসার মাত্রা বেড়ে গেলেও অনেক সময় কোনো লক্ষণ থাকে না। আবার লক্ষণ দেখা দিলে সেগুলো
সাধারণ অসুখের মতো মনে হতে পারে। সম্ভাব্য লক্ষণগুলো হলো:
বারবার পেটব্যথা হওয়া
কোষ্ঠকাঠিন্য
ক্ষুধা কমে যাওয়া
অস্বাভাবিক ক্লান্তি বা দুর্বলতা
রক্তশূন্যতা
মনোযোগ ও শেখার সমস্যা
আচরণে অস্বাভাবিক পরিবর্তন
বয়স অনুযায়ী বিকাশে দেরি
বমি বা বমি বমি ভাব
গুরুতর ক্ষেত্রে খিঁচুনি বা চেতনার পরিবর্তন
মনে রাখবেন: এসব লক্ষণ থাকলেই শিশুর সীসা বিষক্রিয়া হয়েছে, এমন নয়। আবার কোনো লক্ষণ না
থাকলেও রক্তে সীসার মাত্রা বেশি থাকতে পারে। নিশ্চিত হতে রক্ত পরীক্ষা প্রয়োজন।
শিশুদের খাবারে সীসা দূষণ প্রতিরোধের ১১টি উপায়
শিশুদের খাবারে সীসা দূষণ প্রতিরোধে শুধু পরিবার সচেতন হলেই যথেষ্ট নয়। নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন,
নিয়মিত
মান পরীক্ষা এবং বাজারে ভেজাল ও অনিরাপদ খাবার বিক্রি বন্ধ করতে সরকারি নজরদারিও প্রয়োজন। তবে
অভিভাবকেরা প্রতিদিনের কিছু অভ্যাস পরিবর্তন করে শিশুর সীসার সংস্পর্শে আসার ঝুঁকি কমাতে পারেন।
নিচে সীসা দূষণ প্রতিরোধের ১১টি কার্যকর উপায় তুলে ধরা হলো।
নির্ভরযোগ্য উৎস থেকে মশলা কিনুন।
পরিচিত প্রস্তুতকারক, যথাযথ মোড়ক ও পণ্যের তথ্য দেখে হলুদ এবং অন্যান্য মশলা কিনুন। শুধু
উজ্জ্বল রং দেখে ভালো মানের মশলা মনে করবেন না।
প্যাকেটজাত শিশুখাদ্য কেনার সময় সতর্ক থাকুন।
চিপস, বিস্কুট, চকলেট, কেক বা ফলের পানীয় কেনার আগে প্রস্তুতকারকের পরিচয়, মেয়াদ, পণ্যের
লেবেল
এবং প্রযোজ্য অনুমোদন যাচাই করুন। অস্বাভাবিক কম দামের, নকল মোড়কের বা উৎপাদনসংক্রান্ত তথ্যহীন
খাবার এড়িয়ে চলুন।
শাকসবজি ভালোভাবে ধুয়ে নিন।
পরিষ্কার প্রবাহমান পানি দিয়ে সবজির গায়ের মাটি ও ধুলাবালি দূর করুন। প্রয়োজনমতো খোসা
ছাড়ান।
নিরাপদ রান্নার পাত্র ব্যবহার করুন।
ভালো মানের স্টেইনলেস স্টিল ও খাদ্য ব্যবহারের উপযোগী পাত্র বেছে নিন। উৎস অজানা পুনর্ব্যবহৃত
ধাতুর বাসন এড়িয়ে চলুন।
নিরাপদ পানি ব্যবহার করুন।
খাবার ও দুধ তৈরির পানির উৎস সম্পর্কে নিশ্চিত থাকুন। সীসা দূষণের সন্দেহ থাকলে পানি পরীক্ষা
করান।
শিশুর হাত ধোয়ার অভ্যাস গড়ে তুলুন।
খাওয়ার আগে, বাইরে থেকে ফেরার পর এবং মাটিতে খেলার পরে সাবান দিয়ে হাত ধোয়ান।
রান্নাঘর ও খাবার রাখার জায়গা পরিষ্কার রাখুন।
ধুলা জমতে দেবেন না। শুকনোভাবে ঝাড়ু দেওয়ার পরিবর্তে ভেজা কাপড় দিয়ে মুছুন, যাতে ধুলা কম
ছড়ায়।
শিশুদের ব্যাটারির বর্জ্য থেকে দূরে রাখুন।
ব্যাটারি ভাঙা, ধাতু গলানো বা অনিরাপদ রিসাইক্লিংয়ের জায়গায় শিশুদের খেলতে দেবেন না।
সীসাযুক্ত রং ও খেলনার ঝুঁকি এড়ান।
পুরোনো রং খসে পড়লে নিরাপদভাবে ব্যবস্থা নিন। সন্দেহজনক রং করা খেলনা শিশুকে দেবেন না।
শিশুকে সুষম খাবার দিন।
খাবারে আয়রন, ক্যালসিয়াম ও ভিটামিন সি-এর উৎস রাখুন। পর্যাপ্ত পুষ্টি সীসা শোষণের ঝুঁকি কমাতে
সহায়ক হতে পারে।
সন্দেহ হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
শিশুর সম্ভাব্য সীসা সংস্পর্শের ইতিহাস থাকলে চিকিৎসককে জানান। প্রয়োজন হলে রক্তে সীসার
পরীক্ষা
করাতে হবে।
সীসা দূষণের ঝুঁকি কমাতে শিশুদের কী খাওয়াবেন?
শিশু গুরুতর অপুষ্টিতে ভুগলে শুধু সাধারণ খাদ্যতালিকা পরিবর্তন যথেষ্ট নাও হতে পারে। এমন
পরিস্থিতিতে
শিশুদের মারাত্মক
তীব্র অপুষ্টির চিকিৎসা
সম্পর্কে জানা প্রয়োজন। শিশুর খাবারে পর্যাপ্ত আয়রন ও ক্যালসিয়াম থাকা গুরুত্বপূর্ণ। এসব পুষ্টি
উপাদানের ঘাটতি থাকলে শরীর সীসা বেশি শোষণ করতে পারে। তবে কোনো খাবারই শরীরে জমে থাকা সীসা সরিয়ে
দেওয়ার চিকিৎসা নয়।
পুষ্টি উপাদান
খাবারের উৎস
কেন প্রয়োজন
আয়রন
মাছ, মাংস, ডিম, ডাল, শাকসবজি
আয়রনের ঘাটতি প্রতিরোধে সাহায্য করে
ক্যালসিয়াম
দুধ, দই, ক্যালসিয়ামসমৃদ্ধ খাবার
হাড়ের বিকাশ ও পর্যাপ্ত পুষ্টিতে সহায়তা করে
ভিটামিন সি
পেয়ারা, আমলকী, লেবু, টমেটো
উদ্ভিজ্জ খাবারের আয়রন শোষণে সাহায্য করে
প্রোটিন
মাছ, ডিম, মাংস, ডাল
শিশুর স্বাভাবিক বৃদ্ধি ও পুষ্টি বজায় রাখে
শিশুর বয়স, খাবার গ্রহণের ক্ষমতা এবং পুষ্টিগত প্রয়োজন অনুযায়ী খাদ্যতালিকা তৈরি করা উচিত। বিশেষ
করে ছয় মাসের কম বয়সী শিশুর ক্ষেত্রে উপযুক্ত বুকের দুধ খাওয়ানোর নির্দেশনা মেনে চলতে হবে।
শিশুর শরীরে সীসা আছে কি না, কীভাবে পরীক্ষা করবেন?
শিশুর শরীরে সীসার পরিমাণ জানতে Blood Lead Level (BLL) Test করা হয়। এই পরীক্ষায় প্রতি
ডেসিলিটার রক্তে সীসার পরিমাণ নির্ণয় করা হয়। প্রাথমিকভাবে আঙুল থেকে রক্ত নিয়ে পরীক্ষা করা যেতে
পারে। ফলাফল বেশি হলে শিরা থেকে রক্ত সংগ্রহ করে নিশ্চিত হওয়ার প্রয়োজন হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের
Centers
for Disease Control and Prevention (CDC)
শিশুদের রক্তে ৩.৫ µg/dL-কে একটি রেফারেন্স মান হিসেবে ব্যবহার করে।
এটি কোনো নিরাপদ সীমা নয়। বরং তুলনামূলক বেশি সীসার সংস্পর্শে আসা শিশুদের শনাক্ত করার জন্য
ব্যবহার
করা হয়। WHO-ও জানিয়েছে, রক্তে সীসার সম্পূর্ণ নিরাপদ মাত্রা নেই। তাই পরীক্ষার ফলাফল, শিশুর বয়স
ও
সম্ভাব্য দূষণের উৎস বিবেচনা করে চিকিৎসক পরবর্তী ব্যবস্থা নির্ধারণ করেন।
রক্তে সীসা বেশি পাওয়া গেলে কী করবেন?
প্রথমেই আতঙ্কিত না হয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। গুরুতর সীসা বিষক্রিয়ায় বিশেষজ্ঞের তত্ত্বাবধানে
কিলেশন থেরাপি (Chelation Therapy) প্রয়োজন হতে পারে। এটি সবার জন্য নয় এবং নিজে থেকে এই
চিকিৎসা নেওয়া বিপজ্জনক। চিকিৎসক প্রয়োজন অনুযায়ী:
সীসার সম্ভাব্য উৎস শনাক্ত করবেন।
পরীক্ষার ফলাফল নিশ্চিত করতে আবার রক্ত পরীক্ষা দিতে পারেন।
শিশুর শারীরিক বৃদ্ধি ও স্নায়বিক বিকাশ মূল্যায়ন করবেন।
রক্তশূন্যতা বা আয়রনের ঘাটতি আছে কি না, তা দেখবেন।
পুষ্টিগত ঘাটতি থাকলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবেন।
রক্তে সীসার মাত্রা অনুযায়ী পরবর্তী পরীক্ষা ও চিকিৎসার পরিকল্পনা করবেন।
কখন শিশু বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন?
শিশু সীসাযুক্ত খাবার, ধুলাবালি বা অন্য কোনো উৎসের সংস্পর্শে এসেছে বলে সন্দেহ হলে চিকিৎসকের
পরামর্শ নেওয়া উচিত। লক্ষণ দেখা দেওয়ার জন্য অপেক্ষা করার প্রয়োজন নেই। বিশেষ করে শিশুর বারবার
পেটব্যথা, ক্ষুধামন্দা, রক্তশূন্যতা, অস্বাভাবিক ক্লান্তি কিংবা বয়স অনুযায়ী বিকাশে সমস্যা থাকলে
বিষয়টি চিকিৎসককে জানান।
অন্যদিকে খিঁচুনি, চেতনা কমে যাওয়া বা গুরুতর অসুস্থতা দেখা দিলে সরাসরি নিকটস্থ হাসপাতালের জরুরি
বিভাগে যেতে হবে। শিশুর পেটব্যথা, খাবারে অনীহা বা শারীরিক বৃদ্ধি নিয়ে উদ্বেগ থাকলে
শিশুরোগ বিশেষজ্ঞের চিকিৎসাসেবা
সম্পর্কে জেনে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে পারেন।
শিশুর বারবার পেটব্যথা বা কোষ্ঠকাঠিন্য হলে
দীর্ঘদিন ক্ষুধামন্দা বা খাবারে অনীহা থাকলে
বয়স অনুযায়ী ওজন ও উচ্চতা না বাড়লে
রক্তশূন্যতা বা অস্বাভাবিক দুর্বলতা দেখা দিলে
মনোযোগ, স্মৃতিশক্তি বা শেখার সমস্যা হলে
শিশুর আচরণে অস্বাভাবিক পরিবর্তন দেখা দিলে
বয়স অনুযায়ী মানসিক বিকাশে দেরি হলে
সীসা দূষিত খাবার বা পানির সংস্পর্শের সন্দেহ হলে
শিশুর রক্ত পরীক্ষায় সীসার মাত্রা বেশি পাওয়া গেলে
মনে রাখবেন: সীসার বিষক্রিয়ায় সব সময় স্পষ্ট লক্ষণ দেখা যায় না। তাই সীসার সংস্পর্শের
সন্দেহ
থাকলে লক্ষণের জন্য অপেক্ষা না করে শিশু বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন। খিঁচুনি বা চেতনা হারানোর মতো
গুরুতর লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত জরুরি বিভাগে যান।
শিশুর পুষ্টি ও হজমের সমস্যা নিয়ে চিন্তিত?
বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নিন!
শিশুর পেটব্যথা, ক্ষুধামন্দা, অপুষ্টি কিংবা শারীরিক বৃদ্ধি নিয়ে উদ্বেগ থাকলে অভিজ্ঞ চিকিৎসকের
পরামর্শ নিন।
শিশুর বারবার পেটব্যথা, ক্ষুধামন্দা, অপুষ্টি কিংবা বয়স অনুযায়ী বৃদ্ধি না হওয়ার পেছনে বিভিন্ন
কারণ
থাকতে পারে। কখনো হজমের সমস্যা, আবার কখনো খাবারের মাধ্যমে ক্ষতিকর পদার্থের সংস্পর্শও এর সঙ্গে
জড়িত থাকতে পারে।
ডা. সালাহউদ্দিন মাহমুদ
শিশু পরিপাকতন্ত্র, লিভার ও পুষ্টিবিষয়ক বিশেষজ্ঞ। তিনি বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের
সংশ্লিষ্ট বিভাগের অধ্যাপক।
শিক্ষাগত যোগ্যতা ও পেশাগত অর্জন
শিশুদের পুষ্টি, লিভার ও পরিপাকতন্ত্রের চিকিৎসায় তাঁর দীর্ঘ অভিজ্ঞতা রয়েছে।
প্রফেসর ডা. সালাহউদ্দিন মাহমুদের পরিচিতি ও
শিক্ষাগত যোগ্যতা
সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে পারেন। শিশুর দীর্ঘস্থায়ী পেটব্যথা, খাবারে অনীহা, অপুষ্টি বা শারীরিক
বৃদ্ধি নিয়ে উদ্বেগ থাকলে তাঁর পরামর্শ নিতে পারেন।
MBBS, MD (Pediatrics) – ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও বিএসএমএমইউ
Pediatric Nutrition Fellowship – Boston University, USA
Clinical Fellowship – Birmingham Children's Hospital, UK
শিশুর খাবারে সীসা আছে কি না, তা রং, গন্ধ বা স্বাদ দেখে বোঝা যায় না। ভেজাল হলুদ, দূষিত শাকসবজি,
অনিরাপদ রান্নার পাত্র কিংবা পানির মাধ্যমে সীসা শরীরে প্রবেশ করতে পারে। তাই খাবারের উপকরণ কেনার
সময় সতর্ক থাকুন। নিরাপদ পানি ও রান্নার পাত্র ব্যবহার করুন। শিশুর হাত, খাবার রাখার জায়গা এবং
আশপাশের পরিবেশ পরিষ্কার রাখুন। পাশাপাশি বয়স অনুযায়ী পুষ্টিকর খাবার দেওয়াও জরুরি।
দীর্ঘদিন সীসার সংস্পর্শে থাকলে শিশুর মস্তিষ্ক, শেখার ক্ষমতা ও শারীরিক বৃদ্ধি ক্ষতিগ্রস্ত হতে
পারে। অনেক সময় কোনো লক্ষণও দেখা যায় না। তাই খাবার বা পরিবেশ থেকে সীসার সংস্পর্শের সন্দেহ হলে
শিশু বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন। প্রয়োজন অনুযায়ী রক্ত পরীক্ষা করান। সীসা দূষণের উৎস শনাক্ত করে
তা
বন্ধ করাই শিশুকে দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকি থেকে রক্ষার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।
শিশুদের খাবারে সীসা দূষণ নিয়ে অভিভাবকদের মনে নানা প্রশ্ন থাকে। কোন খাবারে সীসা থাকতে পারে,
কীভাবে বিষক্রিয়া শনাক্ত করবেন কিংবা শিশুর রক্তে সীসা পাওয়া গেলে কী করবেন—এসব গুরুত্বপূর্ণ
প্রশ্নের উত্তর নিচে দেওয়া হলো।
হ্যাঁ। বাংলাদেশে ২০২৬ সালে প্রকাশিত এক গবেষণায় কয়েকটি জুস, চকলেট, বিস্কুট ও
বেকারি পণ্যের নমুনায় সীসাসহ অন্যান্য ভারী ধাতু পাওয়া গেছে। তবে সব প্যাকেটজাত
খাবার দূষিত নয়। তাই নির্ভরযোগ্য প্রস্তুতকারকের পণ্য কেনা এবং শিশুর
খাদ্যতালিকায়
অতিরিক্ত প্রক্রিয়াজাত খাবার সীমিত রাখা ভালো।
সীসা দূষিত খাবার বারবার খেলে শিশুর শরীরে সীসার সংস্পর্শ বাড়তে পারে। এতে
মস্তিষ্কের বিকাশ, শেখার ক্ষমতা, আচরণ ও শারীরিক বৃদ্ধি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি
থাকে। কতটা ক্ষতি হবে, তা সীসার পরিমাণ, সংস্পর্শের সময়কাল ও শিশুর অন্যান্য
স্বাস্থ্যগত অবস্থার ওপর নির্ভর করে।
ভেজাল হলুদ ও কিছু গুঁড়া মশলা, দূষিত মাটিতে উৎপাদিত কৃষিপণ্য এবং সীসাযুক্ত পাত্র
বা পানির সংস্পর্শে আসা খাবারে সীসা থাকতে পারে। তবে এসব খাবার সব সময় দূষিত থাকে
না। ঝুঁকি নির্ভর করে উৎপাদন ও ব্যবহারের পরিবেশের ওপর।
না। সাধারণ রান্না, সেদ্ধ করা বা পানি ফুটিয়ে খাবার ও পানির সীসা নির্ভরযোগ্যভাবে
দূর করা যায় না। তাই সীসা দূষণ প্রতিরোধে নিরাপদ উপকরণ, পানি এবং রান্নার পাত্র
ব্যবহার করা বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
WHO অনুযায়ী, রক্তে সীসার কোনো মাত্রাই সম্পূর্ণ নিরাপদ নয়। CDC শিশুদের জন্য ৩.৫
µg/dL রেফারেন্স মান ব্যবহার করে, যা বেশি সীসার সংস্পর্শ শনাক্ত করার একটি
মানদণ্ড। এটি নিরাপদ মাত্রা বোঝায় না।
সীসার উৎস বন্ধ করা এবং সময়মতো চিকিৎসা নেওয়ার মাধ্যমে রক্তে সীসার মাত্রা কমানো
সম্ভব। তবে মস্তিষ্ক ও স্নায়ুতন্ত্রের কিছু ক্ষতি স্থায়ী হতে পারে। তাই সীসা
বিষক্রিয়ার চিকিৎসার পাশাপাশি আগেভাগে প্রতিরোধ করাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
প্রথমে শিশুরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিতে হবে। চিকিৎসক রক্তের পরীক্ষার ফলাফল যাচাই
করবেন, সীসার উৎস শনাক্ত করার চেষ্টা করবেন এবং প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসা ও
ফলোআপের
ব্যবস্থা করবেন। চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া কোনো ডিটক্স ওষুধ বা সাপ্লিমেন্ট দেবেন
না।
সাধারণত না। হলুদের রং, গন্ধ বা স্বাদ দেখে সীসার উপস্থিতি নিশ্চিত করা যায় না।
নির্ভরযোগ্য ফলাফলের জন্য স্বীকৃত পরীক্ষাগারে নমুনা পরীক্ষা প্রয়োজন। তাই পরিচিত
ও
নিরাপদ উৎস থেকে মশলা কেনা ভালো।
আয়রন, ক্যালসিয়াম ও ভিটামিন সি-সমৃদ্ধ সুষম খাবার শিশুর পুষ্টিগত সুরক্ষায়
সাহায্য
করে। মাছ, ডিম, ডাল, দুধ, পেয়ারা ও বয়সোপযোগী অন্যান্য পুষ্টিকর খাবার দিতে
পারেন।
তবে এগুলো সীসা বিষক্রিয়ার বিকল্প চিকিৎসা নয়।
সতর্কতাঃ
ওয়েবসাইটে প্রকাশিত তথ্যসমূহ শুধুমাত্র সচেতনতা ও শিক্ষামূলক উদ্দেশ্যে প্রকাশিত। এটি কোনোভাবেই চিকিৎসা পরামর্শের বিকল্প নয়। চিকিৎসা সংক্রান্ত যেকোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে অবশ্যই একজন বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের পরামর্শ গ্রহণ করুন।
শিশুদের খাবারে সীসা দূষণ ও পুষ্টি সমস্যায় বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন
শিশুর পুষ্টি, হজম ও শারীরিক বৃদ্ধির সমস্যা নিয়ে অভিজ্ঞ শিশু বিশেষজ্ঞ ডা. সালাহউদ্দিন মাহমুদ এর
পরামর্শ নিন।