শিশুর পেটে কৃমি হওয়া খুব পরিচিত একটি সমস্যা। অনেক অভিভাবক প্রথমে
বিষয়টি সাধারণ বলে ধরে নেন। কারণ শিশুর মাঝে মাঝে পেটব্যথা, খাবারে
অনীহা, পায়ুপথে চুলকানি বা অস্থিরতা অনেক সময় অন্য কারণেও হতে পারে।
কিন্তু কৃমির সমস্যা দীর্ঘদিন থাকলে শিশুর পুষ্টি, ঘুম, পড়াশোনা,
মনোযোগ এবং শারীরিক বৃদ্ধির ওপর প্রভাব পড়তে পারে।
বাংলাদেশের মতো দেশে শিশুদের কৃমি বেশি দেখা যায়, কারণ মাটি, পানি,
খাবার, হাতের পরিচ্ছন্নতা এবং টয়লেট ব্যবহারের অভ্যাসের সঙ্গে এ রোগের
সম্পর্ক আছে। শিশুরা খেলাধুলা করে, মাটিতে বসে, হাত মুখে দেয়, নখ
কামড়ায়, আবার অনেক সময় খাবারের আগে ঠিকভাবে হাত ধোয় না। এখান থেকেই
কৃমির ডিম শরীরে ঢুকে যেতে পারে।
তাই শিশুর কৃমির লক্ষণ, শিশুর কৃমির কারণ, শিশুর কৃমির চিকিৎসা এবং
কৃমি প্রতিরোধের উপায় সম্পর্কে অভিভাবকের পরিষ্কার ধারণা থাকা জরুরি।
কৃমি হলো এক ধরনের পরজীবী। এটি শিশুর অন্ত্র বা শরীরের ভেতরে বাস করে
এবং শিশুর খাবার থেকে পুষ্টি গ্রহণ করতে পারে। সব কৃমি এক রকম নয়।
শিশুদের মধ্যে গোলকৃমি, পিনওয়ার্ম বা সুতাকৃমি, হুকওয়ার্ম, টেপওয়ার্মসহ
কয়েক ধরনের কৃমি দেখা যায়।
কিছু কৃমি খুব ছোট হয়। কিছু আবার তুলনামূলক বড়। অনেক সময় শিশুর
পায়খানার সঙ্গে কৃমি দেখা যায়। আবার অনেক সময় কোনো কৃমি দেখা না গেলেও
শিশুর উপসর্গ থাকতে পারে।
শিশুর কৃমির সাধারণ লক্ষণ
শিশুর পেটে কৃমি হলে সবসময় এক ধরনের লক্ষণ দেখা যায় না। কারও পেটব্যথা
হয়, কারও খাবারে অরুচি দেখা দেয়, আবার কারও রাতে পায়ুপথে চুলকানি বা
ঘুমের অস্থিরতা বেশি হয়। অনেক সময় শিশুর দুর্বলতা, ওজন না বাড়া, পেট
ফাঁপা বা বারবার পেটের সমস্যা থেকেও কৃমির সন্দেহ হতে পারে। তাই
লক্ষণগুলো ছোট মনে হলেও বারবার দেখা দিলে বিষয়টিকে গুরুত্ব দেওয়া উচিত।
শিশুর পেটে কৃমি হলে নিচের লক্ষণগুলো দেখা যেতে পারে।
শিশুর কৃমির প্রধান কারণ হলো কৃমির ডিম বা লার্ভা
শরীরে প্রবেশ করা। এটি সাধারণত মুখ দিয়ে শরীরে ঢোকে। অনেক সময় খালি
পায়ে দূষিত মাটিতে হাঁটার মাধ্যমেও কিছু কৃমি শরীরে প্রবেশ করতে পারে।
অপরিষ্কার হাত:
শিশুরা বাইরে খেলে, মাটিতে বসে, খেলনা ধরে, তারপর হাত না ধুয়ে খাবার
খায়। হাতের সঙ্গে কৃমির ডিম মুখে চলে যেতে পারে।
নখ বড় রাখা:
নখের নিচে ময়লা ও জীবাণু জমে। শিশু নখ কামড়ালে বা হাত মুখে দিলে
কৃমির ডিম শরীরে ঢুকতে পারে।
অপরিষ্কার খাবার ও পানি:
ভালোভাবে না ধোয়া ফল, কাঁচা সালাদ, দূষিত পানি, রাস্তার খোলা খাবার
বা অপরিচ্ছন্ন পরিবেশে তৈরি খাবার থেকেও কৃমি ছড়াতে পারে।
টয়লেটের পর হাত না ধোয়া:
টয়লেট ব্যবহারের পর সাবান দিয়ে হাত না ধুলে কৃমির ডিম হাত, কাপড়,
বিছানা, দরজার হাতল বা খেলনায় ছড়িয়ে যেতে পারে।
খালি পায়ে হাঁটা:
দূষিত মাটি বা ভেজা জায়গায় খালি পায়ে হাঁটলে কিছু কৃমির লার্ভা
ত্বকের মাধ্যমে শরীরে ঢুকতে পারে। গ্রামাঞ্চল বা খোলা মাটিতে খেলার
ক্ষেত্রে এই ঝুঁকি বেশি।
পরিবারের অন্য কারও কৃমি থাকা:
কিছু কৃমি, বিশেষ করে পিনওয়ার্ম, পরিবারে একজনের হলে অন্যদের মধ্যেও
ছড়াতে পারে। একই বিছানা, তোয়ালে, কাপড় বা অপরিষ্কার হাতের মাধ্যমে
সংক্রমণ বাড়তে পারে।
শিশুদের কৃমি কীভাবে নির্ণয় করা
হয়?
সবসময় শুধু লক্ষণ দেখে নিশ্চিতভাবে বলা যায় না যে শিশুর কৃমি হয়েছে।
অনেক সময় চিকিৎসক শিশুর বয়স, খাবারের অভ্যাস, টয়লেট ব্যবহারের অভ্যাস,
পেটের সমস্যা, ওজন, ঘুমের সমস্যা এবং পায়খানার ধরন সম্পর্কে জানতে চান।
প্রয়োজনে স্টুল টেস্ট বা পায়খানার পরীক্ষা করা হতে পারে। কিছু ক্ষেত্রে
রক্তশূন্যতা, পুষ্টির ঘাটতি বা অন্য কোনো সমস্যা আছে কি না, তা দেখার
জন্য রক্ত পরীক্ষা দরকার হতে পারে। শিশুর দীর্ঘদিন পেটব্যথা, বারবার
ডায়রিয়া, ওজন না বাড়া বা খাবারে অনীহা থাকলে শুধু কৃমির ওষুধ যথেষ্ট
নাও হতে পারে।
শিশুর কৃমির চিকিৎসা পদ্ধতি
শিশুর কৃমির চিকিৎসা সাধারণত কৃমিনাশক ওষুধ দিয়ে করা হয়। তবে কোন ওষুধ,
কতবার, কতদিন এবং কত ডোজ লাগবে, তা শিশুর বয়স, ওজন, কৃমির ধরন, উপসর্গ
এবং আগের চিকিৎসার ইতিহাসের ওপর নির্ভর করে। তাই শিশুদের কৃমির ওষুধ
নিজের মতো করে বারবার খাওয়ানো উচিত নয়।
অনেক অভিভাবক বাজার থেকে কৃমির ওষুধ কিনে শিশুকে খাইয়ে দেন। একবার হয়তো
সমস্যা কমে যায়, কিন্তু কিছুদিন পর আবার ফিরে আসে। এর কারণ হতে পারে
পুনঃসংক্রমণ, পরিবারের অন্য সদস্যের সংক্রমণ, নখ-হাত-বিছানার
পরিচ্ছন্নতার অভাব, অথবা শিশুর পেটের অন্য সমস্যা। তাই চিকিৎসার
পাশাপাশি পরিচ্ছন্নতা খুব গুরুত্বপূর্ণ।
চিকিৎসার সময় যেসব বিষয় খেয়াল রাখা উচিত
শিশুর বয়স ও ওজন অনুযায়ী ওষুধ দিতে হবে
চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া একই ওষুধ বারবার দেওয়া ঠিক নয়
পরিবারের অন্য সদস্যদের লক্ষণ থাকলে চিকিৎসকের সঙ্গে আলোচনা করতে হবে
শিশুর নখ ছোট রাখতে হবে
বিছানার চাদর, অন্তর্বাস ও তোয়ালে নিয়মিত ধুতে হবে
টয়লেটের পর ও খাবারের আগে সাবান দিয়ে হাত ধোয়ার অভ্যাস করতে হবে
চিকিৎসার পরও লক্ষণ থাকলে আবার ডাক্তার দেখাতে হবে
শিশুর কৃমি হলে ঘরে কী করণীয়?
শিশুর কৃমি হলে শুধু ওষুধ খেলেই সবসময় সমস্যার পুরো সমাধান হয় না। একই
সমস্যা যেন বারবার ফিরে না আসে, সে জন্য ঘরের পরিচ্ছন্নতা, খাবারের
নিরাপত্তা এবং শিশুর দৈনন্দিন অভ্যাসে কিছু পরিবর্তন আনতে হয়। ছোট ছোট
নিয়ম নিয়মিত মানলে কৃমির সংক্রমণ কমানো সহজ হয়।
সাবান দিয়ে হাত ধোয়ার অভ্যাস করুন
নখ ছোট ও পরিষ্কার রাখুন
প্রতিদিন অন্তর্বাস বদলান
সকালে গোসল করান
বিছানা ও কাপড় পরিষ্কার রাখুন
পায়ুপথ চুলকানো থেকে বিরত রাখুন
খাবার ঢেকে রাখুন
ফল ও শাকসবজি ভালোভাবে ধুয়ে দিন
নিরাপদ পানি পান করান
রাস্তার খোলা খাবার এড়িয়ে চলুন
বাইরে খেলতে গেলে জুতা বা স্যান্ডেল পরান
কৃমি হলে
>শিশুকে কী খাবার দেবেন?
কৃমির কারণে শিশুর খাবারে অনীহা থাকতে পারে। তবে শিশুর শরীরের পুষ্টি
ধরে রাখতে নিয়মিত খাবার চালিয়ে যেতে হবে। ভাত, ডাল, মাছ, ডিম, সবজি,
ফল, দুধ বা দই শিশুর বয়স ও সহনশীলতা অনুযায়ী দেওয়া যেতে পারে।
কৃমি হলে শিশুকে একেবারে ঝাল, তেলচর্বি বা বাইরের অস্বাস্থ্যকর খাবার
না দেওয়াই ভালো। যদি শিশুর ডায়রিয়া থাকে, তাহলে তরল খাবার, স্যালাইন,
সহজপাচ্য খাবার এবং চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী খাবার দিতে হবে। শিশুর
যদি বারবার পাতলা পায়খানা হয়, তাহলে শিশুর ডায়রিয়া চিকিৎসা সম্পর্কে
বিশেষজ্ঞ পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
আর যদি শিশুর পেট ফাঁপা, শক্ত পায়খানা বা দীর্ঘদিন কোষ্ঠকাঠিন্য থাকে,
তাহলে শিশুর কোষ্ঠকাঠিন্য চিকিৎসা দরকার হতে পারে।
কখন দ্রুত
শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ দেখাবেন?
শিশুর কৃমি অনেক সময় সাধারণ সমস্যা মনে হলেও কিছু
লক্ষণ দেখা দিলে দেরি করা ঠিক নয়। পেটব্যথা, বমি, পায়খানায় রক্ত, ওজন
কমে যাওয়া বা ওষুধ খাওয়ার পরও বারবার সমস্যা ফিরে এলে শিশুরোগ
বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। সময়মতো চিকিৎসা নিলে শিশুর পুষ্টি,
বৃদ্ধি ও স্বাভাবিক জীবনযাপন ভালোভাবে ধরে রাখা যায়।
শিশুর কৃমি যদি সাধারণ পর্যায়ে থাকে, তাহলে চিকিৎসা
সহজ হতে পারে। কিন্তু সমস্যা বারবার ফিরে এলে, ওজন না বাড়লে, পেটব্যথা
দীর্ঘদিন থাকলে বা ডায়রিয়া-কোষ্ঠকাঠিন্য চলতে থাকলে দেরি না করে
বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
শিশুর কৃমি একটি সাধারণ স্বাস্থ্য সমস্যা, যা পেটব্যথা, ক্ষুধামন্দা,
ওজন কমে যাওয়া বা ঘুমের অস্বস্তির কারণ হতে পারে। সময়মতো লক্ষণ বুঝে
সঠিক চিকিৎসা ও পরিচ্ছন্নতার অভ্যাস বজায় রাখলে এটি সহজেই প্রতিরোধ ও
নিয়ন্ত্রণ করা যায়। নিচে শিশুর কৃমি নিয়ে অভিভাবকদের সাধারণ কিছু
প্রশ্নের উত্তর দেওয়া হলো।
শিশুর কৃমির সাধারণ লক্ষণ হলো পেটব্যথা, ক্ষুধামন্দা, পায়ুপথে
চুলকানি, ঘুমের অস্থিরতা, পেট ফাঁপা, ওজন না বাড়া এবং
দুর্বলতা। তবে সব শিশুর ক্ষেত্রে একই লক্ষণ দেখা যায় না।
না, পায়খানায় কৃমি না দেখলেও কৃমি থাকতে পারে। অনেক সময় কৃমির
ডিম বা ছোট কৃমি চোখে দেখা যায় না। লক্ষণ থাকলে চিকিৎসকের
পরামর্শ নেওয়া ভালো।
এটি শিশুর বয়স, ওজন, ঝুঁকি, পরিবেশ এবং উপসর্গের ওপর নির্ভর
করে। অনেক ক্ষেত্রে নিয়মিত ডিওয়ার্মিং দরকার হতে পারে, কিন্তু
চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া বারবার ওষুধ খাওয়ানো ঠিক নয়।
হ্যাঁ, দীর্ঘদিন কৃমি থাকলে শিশুর ক্ষুধা কমে যেতে পারে,
পুষ্টি শোষণে সমস্যা হতে পারে এবং ওজন ঠিকভাবে না বাড়তে পারে।
তবে ওজন কমার পেছনে অন্য কারণও থাকতে পারে।
কিছু ধরনের কৃমি, বিশেষ করে পিনওয়ার্ম, পরিবারের অন্যদের মধ্যে
ছড়াতে পারে। তাই হাত ধোয়া, নখ ছোট রাখা, বিছানার চাদর ও
অন্তর্বাস পরিষ্কার রাখা খুব জরুরি।
শিশুর অবস্থা ভালো থাকলে সাধারণত স্কুলে যেতে পারে। তবে
পায়ুপথে অতিরিক্ত চুলকানি, দুর্বলতা, পেটব্যথা, ডায়রিয়া বা বমি
থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
খাবারের আগে ও টয়লেটের পর সাবান দিয়ে হাত ধোয়া, নখ ছোট রাখা,
পরিষ্কার খাবার-পানি গ্রহণ, খালি পায়ে নোংরা জায়গায় না হাঁটা
এবং বিছানা-কাপড় পরিষ্কার রাখা সবচেয়ে জরুরি।
সতর্কতাঃ
ওয়েবসাইটে প্রকাশিত তথ্যসমূহ শুধুমাত্র সচেতনতা ও শিক্ষামূলক উদ্দেশ্যে প্রকাশিত। এটি কোনোভাবেই চিকিৎসা পরামর্শের বিকল্প নয়। চিকিৎসা সংক্রান্ত যেকোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে অবশ্যই একজন বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের পরামর্শ গ্রহণ করুন।
শিশুর কৃমি সমস্যায় বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন
কৃমির লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত ডা. সালাহউদ্দিন মাহমুদ এর অভিজ্ঞ শিশুরোগ
বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন।