শিশুর দুধে অ্যালার্জি:
লক্ষণ, কারণ ও খাবার সতর্কতা
দুধ খাওয়ার পর শিশুর গায়ে ফুসকুড়ি, বমি, পেট ব্যথা বা পাতলা পায়খানা হলে অনেক মা-বাবা দুশ্চিন্তায় পড়ে যান। তবে
দুধ খাওয়ার পর হওয়া সব সমস্যাই দুধে অ্যালার্জি নয়। কখনো ল্যাকটোজ অসহিষ্ণুতা, রিফ্লাক্স, পেটের সংক্রমণ বা অন্য
কোনো খাবারের কারণেও একই ধরনের লক্ষণ হতে পারে।
শিশুর দুধে অ্যালার্জি বলতে সাধারণত গরুর দুধের প্রোটিনের প্রতি শরীরের রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থার অস্বাভাবিক
প্রতিক্রিয়াকে বোঝায়। একে কাউ’স মিল্ক প্রোটিন অ্যালার্জি বা CMPA বলা হয়।
সঠিকভাবে রোগ নির্ণয় না করে শিশুর খাবার থেকে দুধ বাদ দিলে প্রোটিন, ক্যালসিয়াম ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় পুষ্টির
ঘাটতি হতে পারে। তাই লক্ষণ দেখা দিলে শিশু বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
গরুর দুধে থাকা কেসিন ও হুই প্রোটিনকে কোনো কোনো শিশুর রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থা ক্ষতিকর উপাদান হিসেবে
শনাক্ত করে। তখন শরীরে অ্যালার্জির প্রতিক্রিয়া শুরু হয়।
দুধে অ্যালার্জির লক্ষণ দুইভাবে প্রকাশ পেতে পারে:
তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া: দুধ বা দুগ্ধজাত খাবার গ্রহণের কয়েক মিনিট থেকে প্রায় দুই ঘণ্টার মধ্যে ফুসকুড়ি,
ঠোঁট ফুলে যাওয়া, বমি, কাশি বা শ্বাসকষ্ট হতে পারে।
বিলম্বিত প্রতিক্রিয়া: দুধ বা দুগ্ধজাত খাবার গ্রহণের কয়েক ঘণ্টা থেকে প্রায় ২–৩ দিনের মধ্যে পাতলা
পায়খানা, কোষ্ঠকাঠিন্য, পায়খানায় রক্ত বা শ্লেষ্মা, একজিমা,
রিফ্লাক্স কিংবা
ওজন না বাড়ার মতো সমস্যা
দেখা দিতে পারে।
শিশুর
দুধে অ্যালার্জির লক্ষণসমূহ
শিশুর বয়স ও অ্যালার্জির ধরনের ওপর লক্ষণ ভিন্ন হতে পারে। দুধ খাওয়ার পর নিচের সমস্যাগুলো বারবার দেখা দিলে
চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলা প্রয়োজন।
দুধে অ্যালার্জির মূল কারণ হলো দুধের প্রোটিনের বিরুদ্ধে রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থার অস্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া। কেন
একটি শিশুর অ্যালার্জি হয় এবং অন্যটির হয় না, তার নির্দিষ্ট কারণ সব সময় জানা যায় না। তবে কয়েকটি ক্ষেত্রে ঝুঁকি
তুলনামূলক বেশি হতে পারে:
পরিবারে খাবার অ্যালার্জি, হাঁপানি বা একজিমার ইতিহাস থাকা
শিশুর আগে থেকেই একজিমা থাকা
অন্য কোনো খাবারে অ্যালার্জি থাকা
শিশুর রোগপ্রতিরোধ ও পরিপাকতন্ত্র পুরোপুরি বিকশিত না হওয়া
অ্যালার্জি শিশুর বা মা-বাবার কোনো ভুলের কারণে হয় না। একই পরিবারের একটি শিশুর দুধে অ্যালার্জি থাকতে পারে,
অন্য শিশুর নাও থাকতে পারে।
বুকের দুধ খাওয়া শিশুর কি দুধে অ্যালার্জি হয়?
শিশুর সাধারণত মায়ের বুকের দুধে অ্যালার্জি হয় না। তবে খুব সংবেদনশীল কোনো শিশুর ক্ষেত্রে মায়ের খাওয়া গরুর
দুধের প্রোটিন সামান্য পরিমাণে বুকের দুধের মাধ্যমে শিশুর শরীরে যেতে পারে।
এ অবস্থায় সাধারণত বুকের দুধ বন্ধ করা হয় না। চিকিৎসক প্রয়োজন মনে করলে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য মায়ের খাবার থেকে
গরুর দুধ ও দুগ্ধজাত খাবার বাদ দেওয়ার পরামর্শ দিতে পারেন।
তবে মা নিজে থেকে দীর্ঘদিন দুধ, দই, মাছ, ডিম বা অন্যান্য পুষ্টিকর খাবার বন্ধ করবেন না। এতে মা ও শিশু উভয়ের
পুষ্টির ঘাটতি হতে পারে।
দুধে
অ্যালার্জি ও ল্যাকটোজ
অসহিষ্ণুতা কি একই?
দুধে অ্যালার্জি এবং ল্যাকটোজ অসহিষ্ণুতা এক নয়।
দুধে অ্যালার্জি হয় দুধের
প্রোটিনের বিরুদ্ধে রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থার প্রতিক্রিয়ার কারণে। এতে ত্বকের ফুসকুড়ি, ঠোঁট ফুলে যাওয়া,
বমি, পায়খানায় রক্ত এবং শ্বাসকষ্ট হতে পারে।
অন্যদিকে, ল্যাকটোজ অসহিষ্ণুতা হয় দুধের শর্করা বা ল্যাকটোজ হজম করতে সমস্যা হলে। এতে সাধারণত পেট ফাঁপা, গ্যাস,
পেট ব্যথা ও পাতলা পায়খানা হয়। ত্বকের ফুসকুড়ি বা শ্বাসকষ্ট সাধারণত হয় না। খুব ছোট শিশুর মধ্যে ল্যাকটোজ
অসহিষ্ণুতা তুলনামূলক বিরল।
মনে রাখতে হবে, ল্যাকটোজমুক্ত গরুর দুধেও দুধের প্রোটিন থাকে। তাই দুধের প্রোটিনে অ্যালার্জি থাকলে
ল্যাকটোজমুক্ত দুধও নিরাপদ নাও হতে পারে।
শিশুর দুধে
অ্যালার্জির চিকিৎসা
দুধে অ্যালার্জির প্রধান ব্যবস্থাপনা হলো চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী দুধের প্রোটিন এড়িয়ে চলা। শিশুর বয়স,
লক্ষণের তীব্রতা এবং সে বুকের দুধ না ফর্মুলা খাচ্ছে—এসবের ওপর চিকিৎসা নির্ভর করে। বুকের দুধ খাওয়া শিশুর
ক্ষেত্রে সাধারণত বুকের দুধ চালিয়ে যেতে বলা হয়। মায়ের খাবার পরিবর্তনের প্রয়োজন হলে শিশু বিশেষজ্ঞ বা
পুষ্টিবিদের পরিকল্পনা অনুযায়ী করতে হবে। ফর্মুলা খাওয়া শিশুর জন্য চিকিৎসক বিশেষভাবে তৈরি
এক্সটেনসিভলি হাইড্রোলাইজড ফর্মুলা পরামর্শ দিতে পারেন।
গুরুতর বা জটিল ক্ষেত্রে
অ্যামিনো অ্যাসিডভিত্তিক ফর্মুলা প্রয়োজন হতে পারে। অনেক শিশুর ক্ষেত্রে এক্সটেনসিভলি হাইড্রোলাইজড
ফর্মুলা উপযোগী হতে পারে। গুরুতর, জটিল বা এই ফর্মুলায় উন্নতি না হলে চিকিৎসক অ্যামিনো অ্যাসিডভিত্তিক ফর্মুলা
বিবেচনা করতে পারেন। চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া সাধারণ ফর্মুলা, ল্যাকটোজমুক্ত ফর্মুলা, সয়া ফর্মুলা বা অন্য কোনো
বিকল্প দুধ দেওয়া উচিত নয়। শিশুর বয়স, লক্ষণ ও পুষ্টির প্রয়োজন অনুযায়ী উপযুক্ত ফর্মুলা নির্বাচন করতে হবে।
দুধে
অ্যালার্জি থাকলে খাবার সতর্কতা
দুধ শুধু গ্লাসে খাওয়ার পানীয় নয়। অনেক প্যাকেটজাত, বেকারি ও রান্না করা খাবারের মধ্যেও দুধের প্রোটিন থাকে।
শিশুর খাবার থেকে নিচের উপাদান বাদ দেওয়ার প্রয়োজন হতে পারে:
গরুর দুধ ও দুধের গুঁড়া
দই, মাখন, ঘি ও ক্রিম
পনির, চিজ ও ছানা
আইসক্রিম ও মিল্কশেক
দুধযুক্ত কেক, বিস্কুট ও পাউরুটি
চকোলেট, পুডিং ও কাস্টার্ড
দুধযুক্ত সিরিয়াল, সস বা শিশুখাদ্য
কোন লক্ষণগুলো দেখা দিলে ডাক্তার দেখানো জরুরি?
কিছু শিশুর ক্ষেত্রে দুধের অ্যালার্জিথেকে গুরুতর প্রতিক্রিয়া বা অ্যানাফাইল্যাক্সিস হতে পারে। নিচের যেকোনো
লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত নিকটস্থ হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নিতে হবে:
শ্বাস নিতে কষ্ট হওয়া
জিহ্বা, মুখ বা গলা ফুলে যাওয়া
শ্বাসের সঙ্গে অস্বাভাবিক শব্দ হওয়া
শিশু হঠাৎ নিস্তেজ হয়ে পড়া
সারা শরীরে ফুসকুড়ির সঙ্গে শ্বাসকষ্ট হওয়া
অচেতন হয়ে যাওয়া
নোট: এ অবস্থায় ঘরোয়া চিকিৎসা বা অনলাইনের পরামর্শের জন্য অপেক্ষা করা নিরাপদ নয়।
শিশুর পুষ্টির ঘাটতি
কীভাবে এড়াবেন?
দুধ বাদ দিলে শিশুর প্রোটিন, ক্যালসিয়াম, ভিটামিন ডি ও শক্তির ঘাটতি হতে পারে। তাই দুধ বাদ দেওয়ার পাশাপাশি
নিরাপদ বিকল্প খাবারের পরিকল্পনা করা জরুরি। শিশুর বয়স অনুযায়ী বিশেষ ফর্মুলা, মাছ, মাংস, ডিম, ডাল ও অন্যান্য
প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবার দেওয়া যেতে পারে।
ক্যালসিয়ামের জন্য চিকিৎসক বা পুষ্টিবিদের পরামর্শ অনুযায়ী উপযুক্ত ক্যালসিয়ামসমৃদ্ধ ও ভিটামিন ডি-সমৃদ্ধ খাবার
বা প্রয়োজনীয় সাপ্লিমেন্ট নির্বাচন করতে হবে। দীর্ঘদিন দুধমুক্ত খাবার চললে শিশুর ওজন ও উচ্চতা নিয়মিত
পর্যবেক্ষণ করা প্রয়োজন। সঠিক বিকল্প পুষ্টির জন্য শিশু বিশেষজ্ঞ বা শিশু পুষ্টিবিদের পরামর্শ নিন।
দুধে অ্যালার্জির সঠিক মূল্যায়নে শিশু বিশেষজ্ঞ
ডা. সালাহউদ্দিন মাহমুদ এর পরামর্শ নিন
দুধ খাওয়ার পর শিশুর বারবার বমি, পাতলা পায়খানা, পায়খানায় রক্ত, ত্বকে ফুসকুড়ি বা ওজন না বাড়ার সমস্যা হলে
অবহেলা করবেন না। আবার সঠিক রোগ নির্ণয় ছাড়া দুধ ও দুগ্ধজাত খাবার পুরোপুরি বন্ধ করাও ঠিক নয়।
ডা. সালাহউদ্দিন মাহমুদশিশু পরিপাকতন্ত্র, লিভার ও পুষ্টিবিষয়ক রোগের চিকিৎসায়
অভিজ্ঞ। তিনি বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের পেডিয়াট্রিক গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজি, হেপাটোলজি ও নিউট্রিশন
বিভাগে অধ্যাপক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
শিশুর খাবারজনিত অ্যালার্জি, দীর্ঘদিনের বমি,
ডায়রিয়া, পেটের সমস্যা বা পুষ্টিজনিত জটিলতার সঠিক মূল্যায়নের জন্য
তাঁর পরামর্শ নিতে পারেন।
শিশুর দুধে অ্যালার্জি সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নোত্তর
শিশুর দুধে অ্যালার্জি নিয়ে মা-বাবার অনেক প্রশ্ন থাকে। লক্ষণ, নিরাপদ খাবার, বিকল্প দুধ ও কখন চিকিৎসকের
পরামর্শ নিতে হবে—এসব গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিচের প্রশ্নোত্তরে সহজভাবে তুলে ধরা হয়েছে।
দুধ খাওয়ার পর শিশুর ত্বকে চাকা বা র্যাশ, চুলকানি, মুখ ফুলে যাওয়া, বমি, ডায়রিয়া, পেটব্যথা, একজিমা,
শ্বাসকষ্ট অথবা পায়খানায় রক্ত বা শ্লেষ্মা দেখা দিতে পারে। লক্ষণ সঙ্গে সঙ্গে অথবা কয়েক ঘণ্টা পরও
প্রকাশ পেতে পারে।
শিশুর রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থা গরুর দুধের কেসিন বা হুইয়ের মতো প্রোটিনকে ক্ষতিকর মনে করে প্রতিক্রিয়া
সৃষ্টি করলে দুধে অ্যালার্জি হয়। এটি ল্যাকটোজ ইনটলারেন্স থেকে আলাদা; ল্যাকটোজ ইনটলারেন্সে মূলত
দুধের শর্করা হজমে সমস্যা হয়।
শিশুর লক্ষণ, খাবারের ইতিহাস ও চিকিৎসকের পরীক্ষার ভিত্তিতে দুধে অ্যালার্জি মূল্যায়ন করা হয়।
তাৎক্ষণিক ধরনের অ্যালার্জি সন্দেহ হলে রক্ত বা ত্বকের পরীক্ষা সহায়ক হতে পারে। তবে বিলম্বিত
অ্যালার্জিতে এসব পরীক্ষা স্বাভাবিকও থাকতে পারে। প্রয়োজন হলে চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে নির্দিষ্ট সময়
দুধের প্রোটিন বাদ দিয়ে পরে পরিকল্পিতভাবে পুনরায় খাবার দেওয়ার মাধ্যমে রোগ নির্ণয় নিশ্চিত করা হয়।
নিজে থেকে শিশুর দুধ বা ফর্মুলা পরিবর্তন করা উচিত নয়। বুকের দুধ খাওয়ানো সাধারণত চালিয়ে যাওয়া যায়;
তবে চিকিৎসক প্রয়োজন মনে করলে মায়ের খাবার থেকে দুগ্ধজাত পণ্য সাময়িক বাদ দিতে বলতে পারেন।
ফর্মুলা-নির্ভর শিশুর জন্য বিশেষ হাইপোঅ্যালার্জেনিক ফর্মুলা প্রয়োজন হতে পারে।
শিশুর শ্বাস নিতে কষ্ট হওয়া, গলা বা জিহ্বা ফুলে যাওয়া, শ্বাসে অস্বাভাবিক শব্দ, বারবার বমি, হঠাৎ
নিস্তেজ হয়ে পড়া বা সাড়া কমে গেলে দ্রুত জরুরি বিভাগে নিতে হবে। এগুলো গুরুতর অ্যালার্জিক
প্রতিক্রিয়ার লক্ষণ হতে পারে।
সতর্কতাঃ
ওয়েবসাইটে প্রকাশিত তথ্যসমূহ শুধুমাত্র সচেতনতা ও শিক্ষামূলক উদ্দেশ্যে প্রকাশিত। এটি কোনোভাবেই চিকিৎসা পরামর্শের বিকল্প নয়। চিকিৎসা সংক্রান্ত যেকোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে অবশ্যই একজন বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের পরামর্শ গ্রহণ করুন।
দক্ষ শিশু বিশেষজ্ঞের পরামর্শ চান?
শিশুর সঠিক চিকিৎসার জন্য আজই ডা. সালাহউদ্দিন মাহমুদ-এর সাথে যোগাযোগ করুন।